কলিতা মাজি : বুয়া থেকে মন্ত্রী, নমিনেশনের আগের দিনও ২ বাসায় কাজ করেছেন

বন্যা নাসরিন

ফিচার

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এখন আলোচিত নাম গুসকরা শহরের কলিতা মাজি। এই সাহসী নারী জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, আর্থিক অনটন এবং সামাজিক

2026-06-04T20:17:29+00:00
2026-06-04T20:17:29+00:00
 
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
কলিতা মাজি : বুয়া থেকে মন্ত্রী, নমিনেশনের আগের দিনও ২ বাসায় কাজ করেছেন
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬, ৮:১৭ পিএম 
কলিতা মাজি। গ্রাফিক : সময়ের আলো
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে এখন আলোচিত নাম গুসকরা শহরের কলিতা মাজি। এই সাহসী নারী জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম, আর্থিক অনটন এবং সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করে বুয়া থেকে মন্ত্রী হয়েছেন। এমনকি নমিনেশনের আগের দিনও ২ বাসায় কাজ করেছেন। তার এই যাত্রা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি বাংলার গ্রামীণ সমাজে নারীর ক্ষমতায়নেরও এক অনন্য উদাহরণ।

পূর্ব বর্ধমান জেলার সাধারণ এক দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা কলিতা মাজির জীবন কখনও সহজ ছিল না। সংসারের আর্থিক টানাপোড়েনে তাকে অল্প বয়স থেকেই অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়। তার স্বামী একজন কলের মিস্ত্রি। একজনের উপার্জনে সংসার টেনে নেওয়া কঠিন বলে তাকে গৃহকর্মীর কাজ করতে হয়। এতগুলো বছর ধরে একমাত্র ছেলেকে মানুষ করতে খেটেছেন দিনরাত। তিনি নিজে কষ্ট করেছেন, ছেলেটা যেন সেই কষ্টের জীবন না পায়, সেই চেষ্টা করে গেছেন। এ বছরই তার পুত্র পার্থ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। স্থানীয় মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন পরিশ্রমী, বিশ্বস্ত এবং সংগ্রামী এক নারী। 

দীর্ঘদিন সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে থাকার অভিজ্ঞতা তাকে জনজীবনের সমস্যাগুলি কাছ থেকে দেখার সুযোগ করে দেয়। সেখান থেকেই রাজনীতির প্রতি তার আগ্রহ জন্মায়। ধীরে ধীরে তিনি জনসংযোগ ও সংগঠনের কাজে যুক্ত হন এবং তৃণমূল স্তরে নিজের পরিচিতি গড়ে তোলেন। প্রায় এক দশক ধরে সক্রিয় জনজীবনে কাজ করার পর তিনি নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। 


২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কলিতা মাজি আউশগ্রাম কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও জয় পাননি। সেবার ১১ হাজার ৮১৫ ভোটে হেরেছিলেন। কিন্তু সেই পরাজয় তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী করেন এই অদম্য নারী। ২০২৬ সালের নির্বাচনে আবারও আউশগ্রাম থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাড়ে ১২ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন। তার এই বিজয়কে অনেকেই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম চমক হিসেবে দেখেছেন। 

বিধায়ক হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই কলিতা মাজি রাজ্যের মন্ত্রিসভায় স্থান পান। ১ জুন তিনি লোকভবনে রাজ্যপাল এবং মুখ্যমন্ত্রীর সামনে প্রতিমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছেন। গৃহকর্মী থেকে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার এই উত্থান পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার মন্ত্রিত্ব প্রাপ্তি তৃণমূল স্তরের কর্মীদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। 

কলিতা মাজি সম্প্রতি এক গণমাধ্যমে বলেন, ‘আমি গরিব পরিবারের একজন বধূ। তাই গরিব মানুষের কষ্ট বুঝি। বিধায়ক হয়েছি, এখন মন্ত্রীও হয়েছি, কিন্তু আমি সাধারণ মানুষ হিসেবেই থাকতে চাই। আতিশয্য চাই না। আউশগ্রামের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।’


নদীয়া জেলার বাসিন্দা শর্মিলা বর্মন সময়ের আলোকে বলেন, ‘প্রথাগত শিক্ষা, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা সব কিছু ছাপিয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে মাটির গন্ধ মিশে থাকা কলিতা মাজির ক্লান্ত, অবসন্ন মুখে জয়ের হাসি। রাজনীতির সীমানা কতটুকু তা আমি জানি না, তবে এই মানুষটা জিতে গিয়ে প্রচলিত অনেক রাজনৈতিক ধ্যানধারণার বদল ঘটালেন। আশা রাখছি, মাটির বুকে পা রেখে চলা কলিতা মাজি রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে এসে কলুষিত ধুলোয় নিজেকে ঢেকে ফেলবেন না। তার হাসি মুখ আজীবন সততা ও পবিত্রতার আলোয় উজ্জ্বল হয়ে থাকুক।’

কলিতা মাজির জীবনকাহিনি শেখায়, রাজনৈতিক নেতৃত্ব কেবল উচ্চবিত্ত বা প্রভাবশালী পরিবারের একচেটিয়া ক্ষেত্র নয়। কঠোর পরিশ্রম, মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং অধ্যবসায় থাকলে সাধারণ মানুষও নেতৃত্বের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছাতে পারেন। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রান্তিক নারীদের কাছে তিনি আজ অনুপ্রেরণার প্রতীক।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাসিন্দা অনিতা রায় সময়ের আলোকে বলেন, ‘কলিতা মাজি বর্তমান সময়ের নবনির্বাচিত মন্ত্রী। আশা রাখি, উনি খেটে খাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। উনি নিজেই যেহেতু গৃহকর্মীর কাজ করতেন, তাই প্রত্যাশা করাই যায় তিনি অসহায়, গরিবদের কথা ভাববেন।’

কলিতা মাজির গল্প একদিকে দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কাহিনি, অন্যদিকে গণতন্ত্রের শক্তিরও প্রমাণ। একজন গৃহকর্মীর হাত থেকে যখন মন্ত্রীর দায়িত্ব উঠে আসে, তখন তা শুধু একজন মানুষের সাফল্য নয়— সমাজের পরিবর্তনেরও প্রতীক হয়ে ওঠে। তার যাত্রাপথ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই বার্তাই দেয়, স্বপ্ন দেখার অধিকার সবার আছে, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথও খোলা থাকে দৃঢ় সংকল্প ও পরিশ্রমের মাধ্যমে।

/মহু

  বিষয়:   কলিতা মাজি  পশ্চিমবঙ্গ  ভারত  প্রতিমন্ত্রী  বিধায়ক  গৃহকর্মী  বর্ধমান 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: