হিমালয় কন্যা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া থেকে উঠে আসা এক লড়াকু অ্যাথলেটের নাম শিরিনা খাতুন শিরিন। সীমান্তের ধুলোমাখা মেঠোপথ থেকে তার জয়যাত্রা আজ জাতীয় গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে। প্রতিকূল সমাজ ও রক্ষণশীলতার দেয়াল ভেঙে শিরিন এখন দেশের ক্রীড়া জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র। এ নিয়ে বিশেষ ফিচার লিখেছেন এসকে দোয়েল
যে হাতে একসময় বই-খাতা ও গৃহস্থালির কাজ ছিল, সেই হাতে আজ দেশের লাল-সবুজ পতাকার সম্মান। তিনি হিমালয়ের পাদদেশের মেয়ে শিরিনা খাতুন শিরিন। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার আজিজনগর গ্রামের এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে আজ অসাধারণ হয়ে উঠেছেন তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও খেলার মাঠের নৈপুণ্যে।
২০০৯ সাল। তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে পড়ার সময় খেলার জগতে হাতেখড়ি শিরিনের। প্রথম কোচ আবুল হোসেন স্যারের হাত ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তা আজ তাকে নিয়ে গেছে রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্টের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে। শিরিন জানান, তার জীবনে ৮ জন কোচের অবদান থাকলেও প্রথম কোচ আবুল হোসেন স্যারই তার ভেতর খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন।
শিরিন কেবল একটি খেলায় সীমাবদ্ধ থাকেননি। ২০১১ সালে জাতীয় পর্যায়ে পা রাখার পর থেকেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন বহুমুখী অ্যাথলেট হিসেবে। হ্যান্ডবল, ভলিবল, থ্রোবল, চেস্টোবল থেকে শুরু করে শুটিং বল— সবকটি জাতীয় দলেই তিনি অপরিহার্য সদস্য। এ ছাড়া রাগবি, ডিউবল, ব্যাডমিন্টন এবং অ্যাথলেটিক্সেও রয়েছে তার সমান পদচারণা।
শিরিনের সাফল্যের ঝুলি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তার উল্লেখযোগ্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে হ্যান্ডবল : এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, বিচ হ্যান্ডবল ওয়ার্ল্ড কাপ এবং সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণ। চ্যাম্পিয়ন শিরোপা : ওয়ার্ল্ড কাপ চেস্টোবলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড কাপ শুটিং বল ও থ্রোবল এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে রানারআপ এবং থাইল্যান্ড ফ্রেন্ডশিপ ভলিবলে ৩য় স্থান অর্জন। সেরা স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে রেকর্ড ২২ বার এবং বিদেশের মাটিতে ৪ বার সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতার খ্যাতি অর্জন করেছেন তিনি।
মাঠের খেলার পাশাপাশি শিরিন একজন দক্ষ সংগঠক ও নেতা। তিনি সাউথ এশিয়ান গেমসে ভাইস ক্যাপ্টেন এবং অনূর্ধ্ব-১৭ ও অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলের ক্যাপ্টেনের দায়িত্ব পালন করেছেন। শুটিং বল ওয়ার্ল্ডকাপ এবং চেস্টোবলেও তিনি সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। নিজে খেলার পাশাপাশি নতুন খেলোয়াড় গড়ার কারিগর হিসেবেও কাজ করছেন শিরিন। তিনি জয়পুরহাট ক্যাডেট কলেজ এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাথলেটিকস টিমের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন সফলভাবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ টিমে নিয়মিত খেলার পাশাপাশি বর্তমানে শিক্ষক হিসেব কর্মরত রয়েছেন রাজেন্দ্রপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজে। এদিকে আনসার বিডিপির ভাতাভুক্ত খেলোয়াড়ও তিনি।
সীমান্তঘেঁষা আজিজনগর গ্রাম থেকে তার উঠে আসাটা সহজ ছিল না। সমাজ ও চারপাশের মানুষের বাঁকা চোখ, 'মেয়ে মানুষ কেন ঘরের বাইরে খেলবে'—এমন হাজারও নেতিবাচক মন্তব্য তাকে শুনতে হয়েছে। পরিবার থেকেও শুরুতে ছিল প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু শিরিন দমে যাননি। নিজের সাফল্যের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, মেধা ও পরিশ্রম থাকলে সমাজ বদলে দেওয়া সম্ভব। যারা তাকে নিয়ে সমালোচনা করত, তারাই এখন শিরিনের আন্তর্জাতিক সাফল্যে গর্ববোধ করে।
শিরিনের ভাষায়, ‘মেয়েদের অনেক বাধা আসবে, তবে সেগুলো কাটিয়ে উঠে দেশ ও জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনতে হবে। মাঠই আমাদের পরিচয়।’ এই অ্যাথলেট মনে করেন, মেয়েদের জন্য প্রতিবন্ধকতা থাকবেই, কিন্তু লক্ষ্য যদি অটুট থাকে, তবে জয় সুনিশ্চিত।
আবুল হোসেন বলেন, ‘শিরীন আমার ছাত্রী ছিল। কঠোর পরিশ্রম, অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সে নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছে। তার এই সাফল্যে আমি গর্ববোধ করি। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে— এটাই আমার প্রত্যাশা ও শুভকামনা।’
তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতাকে জয় করে আমাদের মেয়েরা ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করছে। শিরিনা খাতুন শিরিন তাদেরই উজ্জ্বল উদাহরণ। তার মতো খেলোয়াড়দের সাফল্যে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গৌরব ও সম্মান অর্জন করেছে।’
সীমান্তের এই আলোকিত কন্যা শিরিনা খাতুন শিরিন আজ কেবল তেঁতুলিয়ার গর্ব নন, তিনি গোটা বাংলাদেশের অনুপ্রেরণা।
/মহু