নার্স এডিথ ক্যাভেল : মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছিলেন যিনি

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত দিনগুলোতে যখন চারদিকে শুধু যুদ্ধ, ধ্বংস আর বিভক্তির গল্প, তখনও কিছু মানুষ মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন নিঃশব্দে। এমনই

2026-05-12T16:10:56+00:00
2026-05-12T16:10:56+00:00
 
  শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২০ ভাদ্র ১৪৩৩
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
নার্স এডিথ ক্যাভেল : মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছিলেন যিনি
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬, ৪:১০ পিএম 
এডিথ লুইসা ক্যাভেল। ছবি : সংগৃহীত
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রক্তাক্ত দিনগুলোতে যখন চারদিকে শুধু যুদ্ধ, ধ্বংস আর বিভক্তির গল্প, তখনও কিছু মানুষ মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন নিঃশব্দে। এমনই একজন ছিলেন ব্রিটিশ নার্স এডিথ ক্যাভেল— যিনি যুদ্ধক্ষেত্রে শুধু আহতদের সেবাই করেননি, নিজের জীবন বাজি রেখে শতাধিক সৈন্যকে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়ে সেই মানবিক কাজের মূল্য দিতে হয় তাঁকে।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের নাম আমাদের কাছে পরিচিত। কিন্তু এডিথ ক্যাভেলের গল্প তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত, যদিও সাহস, নৈতিকতা ও মানবতার দিক থেকে তাঁর জীবনও কম অনুপ্রেরণাদায়ক নয়।

Advertisement
১৮৬৫ সালের ৪ ডিসেম্বর ইংল্যান্ডের নরফোকে জন্মগ্রহণ করেন এডিথ লুইসা ক্যাভেল। তাঁর বাবা রেভারেন্ড ফ্রেডরিক ক্যাভেল ছিলেন গির্জার ধর্মযাজক এবং মা লুইসা সোফিয়া ওয়ার্মিং। চার ভাইবোনের মধ্যে এডিথ ছিলেন সবার বড়।

কিশোরী বয়সে এডিথ ক্যাভেল।

কিশোরী বয়সে এডিথ ক্যাভেল।


শৈশবেই পরিবার থেকে দায়িত্ববোধ ও সেবার মানসিকতা শিখেছিলেন তিনি। প্রথমে স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করলেও পরে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি হন। জীবনের মোড় ঘুরে যায় বাবার অসুস্থতার সময়। ১৮৯০-এর দশকে বাবার সেবাযত্ন করতে বাড়ি ফিরে এসে এডিথ উপলব্ধি করেন— নিজেকে নার্সিং পেশায় নিয়োজিত করাই তাঁর পথ।

১৮৯৬ সালে ৩০ বছর বয়সে লন্ডন হাসপাতালে নার্স প্রবেশনার হিসেবে যোগ দেন তিনি। এরপর বিভিন্ন হাসপাতালে কাজ করেন এবং দ্রুতই দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ নার্স হিসেবে পরিচিতি পান।

১৮৯৭ সালে ইংল্যান্ডের মেইডস্টনে টাইফয়েড মহামারির সময় তাঁর নিরলস কাজ বিশেষভাবে আলোচিত হয়। সেখানে অসংখ্য রোগীর সেবা দিয়ে তিনি অর্জন করেন ‘মেইডস্টন মেডেল’।

তবে এডিথ ক্যাভেলের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯১৪ সালে যুদ্ধ শুরু হলে জার্মান বাহিনী বেলজিয়াম দখল করে নেয়। সেই সময় ব্রাসেলসে একটি রেড ক্রস-সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে কাজ করছিলেন এডিথ।

যুদ্ধের নিয়ম অনুযায়ী আহত যে কেউ— সে মিত্রবাহিনীর হোক বা শত্রুপক্ষের— চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রাখে। এডিথ এই নীতিতে অটল ছিলেন। তিনি শুধু আহতদের চিকিৎসাই করেননি, গোপনে ব্রিটিশ, ফরাসি ও বেলজিয়ান সৈন্যদের জার্মান অধিকৃত এলাকা থেকে পালিয়ে নিরপেক্ষ নেদারল্যান্ডসে পৌঁছাতে সাহায্য করেন। ধারণা করা হয়, প্রায় ২০০ সৈন্যকে তিনি পালাতে সহায়তা করেছিলেন।

আমি কীভাবে থেমে থাকি, যখন আমার চারপাশে এত মানুষ আহত- এডিথ ক্যাভেল

আমি কীভাবে থেমে থাকি, যখন আমার চারপাশে এত মানুষ আহত- এডিথ ক্যাভেল


এটি ছিল ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। কারণ জার্মান বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এমন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করা মানে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো।

অবশেষে ১৯১৫ সালের ৫ আগস্ট এডিথ ধরা পড়েন। তাঁকে ব্রাসেলসের সেন্ট গিলস কারাগারে একাকী বন্দি করে রাখা হয়। পরে সামরিক আদালতে তাঁর বিচার শুরু হয়। বিচারে নিজের কাজ অস্বীকার করেননি এডিথ। বরং শান্তভাবে স্বীকার করেন, তিনি সৈন্যদের পালাতে সাহায্য করেছেন। তাঁর কাছে আহত ও বিপদগ্রস্ত মানুষের জীবনই ছিল মুখ্য।

তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কীভাবে থেমে থাকি, যখন আমার চারপাশে এত মানুষ আহত?’ এরপর জার্মান সামরিক আদালত তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়।


১৯১৫ সালের ১২ অক্টোবর, ৪৯ বছর বয়সে, ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে দাঁড় করানো হয় এডিথ ক্যাভেলকে। মৃত্যুর আগে তাঁর শান্ত ও দৃঢ় অবস্থান উপস্থিত সবার মনে গভীর ছাপ ফেলে।

তাঁর মৃত্যুদণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধকালীন প্রচারণায় এডিথ দ্রুতই এক প্রতীকে পরিণত হন— একজন নার্স, যিনি মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়ে জীবন দিয়েছেন।

যুদ্ধ শেষে তাঁর মরদেহ ব্রিটেনে ফিরিয়ে আনা হয় এবং নরউইচে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

তবে এডিথ ক্যাভেলের গুরুত্ব কেবল তাঁর করুণ পরিণতিতে নয়। বরং তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন এক ভিন্ন কারণে— যুদ্ধ, জাতীয়তা ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।

তাঁর জীবন দেখায়, সাহস সবসময় অস্ত্র হাতে লড়াই নয়; কখনও কখনও তা হয় আহত, বিপন্ন ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অসংখ্য নারী নার্সিং পেশায় আসতে অনুপ্রাণিত হন এডিথের গল্প থেকে। আজও তিনি সাহস, সহমর্মিতা ও মানবতার এক অনন্য প্রতীক।

দেশপ্রেম হয়ত মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, কিন্তু এডিথ ক্যাভেল দেখিয়েছেন— মানবতাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরিচয়।

/মহু

  বিষয়:   নার্স  এডিথ ক্যাভেল 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: