বাংলাদেশের সর্ব উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জনপদ তেঁতুলিয়া। হিমালয় কন্যা হিসেবে পরিচিত এই জনপদের প্রত্যন্ত গ্রাম সাহেবজোতের মেয়ে খুকুমণি তানিয়া। দারিদ্র্য, পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা ও সমাজের ভ্রূকুটি উপেক্ষা করে তানিয়া আজ জাতীয় পর্যায়ের একজন সফল অ্যাথলেট।
তানিয়া বর্তমানে বাংলাদেশ আনসারের একজন নিয়মিত খেলোয়াড়। কোরিয়ান মার্শাল আর্ট তায়কোয়ান্দোতে তিনি ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তায়কোয়ান্দো স্বাধীনতা কাপে ব্রোঞ্জ, বিজয় দিবস কাপে রৌপ্য এবং জাতীয় তায়কোয়ান্দো প্রতিযোগিতায় ব্রোঞ্জ পদক জয় করেছেন তিনি। তায়কোয়ান্দোর পাশাপাশি হ্যান্ডবলেও সমান পারদর্শী তানিয়া। জাতীয় হ্যান্ডবল টুর্নামেন্টে রানারআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। এ ছাড়া ভলিবল, কাবাডি ও অ্যাথলেটিক্সেও রয়েছে তার সরব উপস্থিতি।
২০১৩ সালে তেঁতুলিয়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই খেলার প্রতি তার ঝোঁক ছিল। তবে, কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ভর্তি হওয়ার পর তার প্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
তানিয়া জানান, শুরুর পথটা মসৃণ ছিল না। দারিদ্র্যের পাশাপাশি ছিল পারিবারিক বাধা। তার মা শুরুতে খেলাধুলার চরম বিপক্ষে ছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক আব্দুস সালামের হস্তক্ষেপে তানিয়া তার পথচলা অব্যাহত রাখতে পারেন। তিনি কেবল স্কুলেই নয়, তানিয়ার বাড়িতে গিয়েও তার পরিবারকে খেলাধুলার গুরুত্ব বুঝিয়েছিলেন।
তানিয়ার ক্রীড়াজীবনের প্রথম পথপ্রদর্শক ছিলেন আব্দুস সালাম। পরবর্তীতে তায়কোয়ান্দোতে তাকে হাতেখড়ি দেন প্রশিক্ষক কোরবান আলী। বিভিন্ন সময়ে প্রায় সাতজন কোচের অধীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। খেলোয়াড় হিসেবে সফলতার পাশাপাশি হ্যান্ডবল ম্যাচে রেফারির দায়িত্বও পালন করেছেন, যা তার ক্রীড়াঙ্গনের প্রতি অগাধ ভালোবাসার প্রমাণ।
তানিয়ার দৃষ্টি এখন আরও উঁচুতে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা তুলে ধরার স্বপ্ন দেখেন তিনি। তানিয়া বলেন, ‘খেলাধুলা কেবল শরীরচর্চা নয়, এটি মানুষকে মানসিকভাবে শক্তিশালী করে। পরিবার ও সমাজের অনেক বাধা পেরিয়ে আজ এই অবস্থানে পৌঁছেছি। আমার বিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম একদিন আমাকে আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিয়ে যাবে।’
নতুন প্রজন্মের নারী খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে তানিয়ার আহ্বান— সামাজিক বাধা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য উপেক্ষা করে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে।
সীমান্তের মেঠোপথ থেকে উঠে আসা এই অদম্য কন্যা তানিয়া আজ তেঁতুলিয়ার গর্ব। তিনি প্রমাণ করেছেন, স্বপ্ন জয়ের ইচ্ছা থাকলে দারিদ্র্য কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব কোনো প্রতিবন্ধকতাই নয়।
কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শরীরচর্চা আব্দুস সালাম বলেন, ‘খুকুমণি তানিয়া আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কঠোর পরিশ্রম ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি নিজের ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন, যা এলাকাবাসীর জন্য গর্বের বিষয়।’
তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের অধ্যক্ষ ইমদাদুল হক বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা জয় করে আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীরা ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করছে এবং এই অর্জন প্রতিষ্ঠানকে গৌরব ও সম্মান এনে দিচ্ছে।’
/মহু