একসময় বিচ্ছেদ মানেই ছিল মুখোমুখি কথা বলে সম্পর্কের ইতি টানা কিংবা আইনি প্রক্রিয়ায় আলাদা হয়ে যাওয়া। কিন্তু প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে সম্পর্কের অভিধানে নতুন নতুন শব্দ যোগ হচ্ছে। তেমনই এক আলোচিত ও বিতর্কিত শব্দ ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’।
মনে হতে পারে, এটা কোনো আইনি বিচ্ছেদ প্রক্রিয়া। কিন্তু, বাস্তবে এর সঙ্গে আদালতের সম্পর্ক তো নেই ই, ডিভোর্সেরও সম্পর্ক নেই! ডিভোর্সের সম্পর্ক না থাকলে এর নাম কেন অ্যালপাইন ডিভোর্স হলো, সেটাই ভাবছেন তো? এটি আসলে এমন এক আচরণের বর্ণনা, যেখানে একজন সঙ্গী পাহাড়ি ট্রেক, হাইকিং বা দুর্গম ভ্রমণের সময় অন্য সঙ্গীকে ইচ্ছাকৃতভাবে পেছনে ফেলে চলে যায়- কখনো রাগে, কখনো ক্ষমতার প্রদর্শনে, কখনো বা সম্পর্কের গভীর সংকটের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে।
অ্যালপাইন ডিভোর্স নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ একটি বহুল আলোচিত অস্ট্রিয়ান মামলা। প্রতিবেদনে উঠে আসে, টমাস পি. নামের এক অভিজ্ঞ পর্বতারোহী তার বান্ধবী কার্সটিন গার্টনারকে দুর্গম পাহাড়ে ক্লান্ত অবস্থায় রেখে একা নিচে নেমে যান। পরবর্তীতে তীব্র ঠান্ডা ও হাইপোথার্মিয়ায় ওই নারীর মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আদালত পুরুষ সঙ্গীকে গুরুতর অবহেলা বা গ্রস নেগ্লিজেন্ট ম্যানস্লটারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি প্রদান করে। ঘটনাটি সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং ‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ ধারণাটিকে নতুন করে আলোচনায় আনে।
এই ঘটনার পর বহু মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ- হাইকিং বা পাহাড়ি অভিযানের সময় সঙ্গী তাদের একা ফেলে চলে গেছে, সহযোগিতা করেনি বা ইচ্ছাকৃতভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে যাতে তারা বিপদে পড়ে।
অনেক ক্ষেত্রে এটি শুধু দ্রুত হাঁটা বা এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং সম্পর্কের ভেতরে থাকা অবহেলা, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ কিংবা মানসিক নির্যাতনের প্রতীক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি কোনো আইনি বিচ্ছেদ নয়। পাহাড়ে বা দুর্গম পরিবেশে সঙ্গীকে একা ফেলে যাওয়ার ঘটনাকে রূপক অর্থে ‘ডিভোর্স’ বলা হচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনেক সময় সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং সহমর্মিতার অভাব এমন আচরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। একজন মানুষ যখন জানেন তার সঙ্গী শারীরিকভাবে দুর্বল, পথ ঠিকমতো চেনেন না বা নিরাপত্তার জন্য তার ওপর নির্ভর করছেন, তখন তাকে একা ফেলে চলে যাওয়া শুধু অসৌজন্যমূলক আচরণ নয়, এটি সেই সঙ্গীর জন্য বিপজ্জনকও হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালপাইন ডিভোর্স মূলত তিন ধরনের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। সুস্থ সম্পর্কে একজন সঙ্গী অন্যজনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে চেষ্টা করেন। কিন্তু এখানে দেখা যায়, একজনের নিরাপত্তা অন্যজনের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত হাঁটা, পেছনে ফেলে যাওয়া বা সহযোগিতা না করা ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি উপায় হয়ে দাঁড়ায়। এতে সম্পর্কের অসম শক্তি প্রকাশ পায়। অনেক মানুষ সরাসরি সমস্যা নিয়ে কথা বলার বদলে এড়িয়ে যেতে চান। পাহাড়ে বা নির্জন পরিবেশে সঙ্গীকে ফেলে যাওয়া সেই এড়িয়ে যাওয়ার চরম রূপ হিসেবে দেখা হয়।
অ্যালপাইন ডিভোর্সের সব ঘটনা পাহাড়ে ঘটে না। অনেকের কাছে এটি একটি প্রতীক মাত্র। যখন একজন মানুষ জীবনের কঠিন সময়ে সঙ্গীর সমর্থন আশা করেন, কিন্তু বদলে অবহেলা পান, তখন সেটিও অনেকের কাছে ‘রূপক অ্যালপাইন ডিভোর্স’।
পর্বতারোহণ ও হাইকিং সংগঠনগুলোর একটি মৌলিক নীতি হলো- দলের সবচেয়ে ধীর সদস্যের গতিকে সম্মান করা। দুর্গম পরিবেশে কাউকে একা ফেলে যাওয়া বিপজ্জনক এবং কখনও কখনও প্রাণঘাতীও হতে পারে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করেছেন, পাহাড়ে একে অপরের দায়িত্ব নেওয়া শুধু সৌজন্য নয়, জীবনরক্ষারও অংশ।
‘অ্যালপাইন ডিভোর্স’ ধারণাটি হয়ত নতুন করে আমরা শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে এক চিরকালীন প্রশ্ন- সম্পর্কে সংকটের মুহূর্তে আমরা একে অপরের পাশে দাঁড়াই, নাকি পেছনে ফেলে চলে যাই? পাহাড়ের খাড়া ঢাল, বরফঢাকা পথ কিংবা দুর্গম ট্রেইল এখানে শুধু প্রেক্ষাপট। আসল গল্পটি বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার। একজন মানুষ হাঁপিয়ে উঠলে অন্যজন তার হাত ধরে কী না, তার ওপর নির্ভর করে সম্পর্কের প্রকৃত মূল্যায়ন।
/মহু