একদিকে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক অনলাইন জুয়ার বিস্তার, অন্যদিকে সরকারি অফিস-আদালত, ভূমি অফিস, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস ও বিভিন্ন সেবাকেন্দ্র ঘিরে সক্রিয় টাউট চক্র। দীর্ঘদিনের এই সমস্যার সমাধানে পৃথক দুটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এ লক্ষ্যে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৩ (প্রস্তাবিত)’ এবং ‘টাউট নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৪ (প্রস্তাবিত)’-এর খসড়া তৈরি করে জনমত গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশও করা হয়েছিল। কিন্তু খসড়া তৈরির পর তিন বছর গড়িয়ে গেলেও আইন দুটি এখনও সংসদের দরজায় পৌঁছাতে পারেনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও এ বিষয়ে দুটি অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয়েছিল। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাসিক সভায় জানানো হয় অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই অধ্যাদেশ দুটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে পুনরায় আইনে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিষয়ে গৃহীত কার্যক্রমের অগ্রগতি আগামী সভায় উপস্থাপন করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারি সেবা গ্রহণে সাধারণ মানুষের অন্যতম অভিযোগ হলো টাউট বা দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য। ভূমি অফিস, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, আদালত পাড়া, নিবন্ধন কার্যালয় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সরকারি সেবাকেন্দ্রে এদের সক্রিয়তা নিয়ে বহু বছর ধরে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এসব কর্মকাণ্ডকে সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে আইনগত কাঠামো তৈরির লক্ষে ১৪৫ বছরের পুরোনো টাউট আইন, ১৮৭৯ হালনাগাদ করে টাউট নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০২৪ প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল দালালি, ভুয়া প্রতিশ্রুতি, সরকারি সেবা পাওয়ার নামে অর্থ আদায় এবং নাগরিক হয়রানিকে একটি স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা। এ আইনের খসড়ায় আদালত, থানা, হাসপাতাল, ভূমি, রাজস্ব, রেজিস্ট্রি, পাসপোর্ট অফিস ও সরকারি লাইসেন্স প্রদানকারী দফতর, রোড ট্রান্সপোর্ট অফিস, রেলস্টেশন, টার্মিনাল, পাবলিক রিসোর্ট ও সরকারি সেবা প্রদানকারী যেকোনো অফিসে দালালদের তৎপরতার বিষয় উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু খসড়া প্রকাশের পর আইনটির আর কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। আইনটি এখনও চূড়ান্ত না হওয়ায় টাউট দমনে প্রশাসনকে প্রচলিত দণ্ডবিধি, ভোক্তা অধিকার, প্রতারণা ও জনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত বিধানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে টাউটদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করেন।
আরও পড়ুন
অন্যদিকে বাংলাদেশে জুয়া নিয়ন্ত্রণে এখনও মূল ভিত্তি ব্রিটিশ আমলের পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট ১৮৬৭। ১৫০ বছরের বেশি পুরোনো এই আইনে অনলাইন বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো, বিদেশি জুয়ার অ্যাপ, ডিজিটাল ওয়ালেট বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে জুয়ার মতো আধুনিক অপরাধের স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এ কারণে আইনটি আরও যুগোপযোগী করতে ২০২৩ সালে প্রকাশিত খসড়া জুয়া প্রতিরোধ আইনে অনলাইন জুয়া, পাতানো খেলা এবং প্রযুক্তিনির্ভর জুয়ার নতুন ধরনগুলোকে আইনের আওতায় আনার প্রস্তাব ছিল। খসড়ায় শাস্তি ও অর্থদণ্ডের বিধানও বিদ্যমান আইনের তুলনায় কঠোর করা হয়। তবে ২০২৫ সালে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশে অনলাইন জুয়া পরিচালনা, প্রচার বা অংশগ্রহণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ওই আইনে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়। ফলে পৃথক জুয়া প্রতিরোধ আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা ও এর সঙ্গে বিদ্যমান আইনের সমন্বয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
আইন দুটি এখনও খসড়ার পর্যায়ে থাকলেও বাস্তবে অনলাইন জুয়ার বিস্তার এবং টাউট চক্রের সক্রিয়তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেছে। একইভাবে সরকারি সেবাকেন্দ্রগুলোতেও টাউটবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু পৃথক ও আধুনিক আইনি কাঠামোর অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান আইন ব্যবহার করে ব্যবস্থা নিতে হচ্ছে।
মাদক, অনলাইন জুয়া ও বেটিং নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন প্রণয়নের প্রস্তুতির কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ১৮৬৭ সালের জুয়া আইন বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনলাইন জুয়া, বেটিং, মাদক ও অর্থ পাচার সব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে আধুনিক আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। আগামী সংসদ অধিবেশনেই এটি উত্থাপনের চেষ্টা থাকবে। এ ছাড়া টাউট নিয়ন্ত্রণ আইন প্রণয়নের বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
এএডি/