মে মাসে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন দলের ২৮৯ জনেরও বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বিএনপির একজন, জামায়াতের একজন, পার্বত্য চট্টগ্রামকেন্দ্রিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফের দুজন ও একজন সাধারণ নারী।
অন্যদিকে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩১ জন। শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)।’ ‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ ও হামলা, দলীয় অন্তর্কোন্দল ও চাঁদাবাজিকেন্দ্রিক অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে’ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া গত মাসে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ২৩টিরও বেশি মামলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং এইচআরএসএসের সংগ্রহ করা তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত মে মাসের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫ জন এবং আহত হয়েছেন ২৮৯ জন। মে মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা এপ্রিল মাসের তুলনায় কমেছে। গত এপ্রিল মাসে ৯৮টি ‘রাজনৈতিক সহিংসতার’ ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৩৩ জন।
আরও পড়ুন
রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় মে মাসে ৬৪টি ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ১টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১১৪ জন। বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে ১০টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৪৯ জন, নিহত হয়েছেন একজন, বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে ১৪টি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭২ জন, নিহত হয়েছেন দুজন। বিএনপি-এনসিপির মধ্যে দুটি সংঘর্ষের ঘটনায় আহত হয়েছেন দুজন, বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে ১১টি সংঘর্ষের ঘটনায় ২৭ জন আহত হয়েছেন। বিভিন্ন দলের মধ্যে সাতটি ঘটনায় আহত হয়েছেন ২৫ জন।
মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মাসে গণপিটুনি ও মব সহিংসতায় সারা দেশে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাকবিতণ্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননাসহ নানা অভিযোগে ৬৬টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩১ জন, আহত হয়েছেন ৬৮ জন।
৩০৫ নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার : ওই মাসে ৩০৫ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ৮৩ জন নারী, শিশু ও কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৭ জন ১৮ বছরের কম বয়সি শিশু ও কিশোরী। ১৭ জন নারী ও কন্যাশিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে ৭৬ জন নারী ও কন্যাশিশু যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন যার মধ্যে শিশু ৪২ জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ৩, আহত ৪ এবং আত্মহত্যা করেছেন ১ নারী। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ৬৩ জন, আহত হয়েছেন ৩১ জন ও আত্মহত্যা করেছেন ৪৫ জন নারী। এ ছাড়া এসিড নিক্ষেপের ঘটনায় আহত হয়েছেন ১ জন।
অন্যদিকে অন্তত ২১৫ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন যাদের মধ্যে ৫৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২১১ জন শিশু শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
নির্যাতন-হয়রানির শিকার ৭৮ সাংবাদিক : মে মাসে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৪২ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ১৮ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ৯ জন সাংবাদিক। একজন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি মামলায় ৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যা, থানা ও কারাগারে মৃত্যুর বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ, ভিকটিমের পরিবার ও এইচআরএসএসের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ মে সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জের শতমুখী খাল এলাকায় বন বিভাগের কর্মকর্তার গুলিতে একজন এবং মাদকবিরোধী অভিযানের সময় পালাতে গিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া এ মাসে সারা দেশে কারাগারে কমপক্ষে ৭ জন আসামি মারা গেছেন, যার মধ্যে চারজন কয়েদি ও তিনজন হাজতি। এর মধ্যে একজন আওয়ামী লীগের এবং ৬ জন সাধারণ কয়েদি মারা গেছেন।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ : ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন ও মাজারে হামলার ঘটনার উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ মাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ৩টি হামলার ঘটনায় ৫ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া ৬টি বসতবাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর এবং ১টি ভূমি দখলের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া কুষ্টিয়া ও ঢাকায় পৃথক ২টি মাজারে হামলার ঘটনা ঘটেছে, এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হন।
ভারত সীমান্তে নিহত ৬, মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৩ প্রাণহানি : সীমান্তে হতাহত ও আটকের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে এইচআরএসএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মে মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ৬টি হামলার ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এ ছাড়া বিএসএফ কর্তৃক ১৪ জনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত ও ১ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪টি ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করেছে আরাকান আর্মি।
মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে হয়রানিতে উদ্বেগ : এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, মাসজুড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্তে সহিংসতা, শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনার ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে এ মাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার, হয়রানি ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরো জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সব নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে অধিক সোচ্চার ও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানান তিনি।
এএডি/