স্টার্টআপ : বাজেটে তরুণদের জন্য সুখবর

এসএম আলমগীর

জাতীয়

বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে তরুণদের ভাগ্যোন্নয়নের দিকে বেশ জোর দিয়েছে। তাদের নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন খোদ

2026-06-07T01:01:49+00:00
2026-06-07T01:01:49+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
জাতীয়
স্টার্টআপ : বাজেটে তরুণদের জন্য সুখবর
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ১:০১ এএম   (ভিজিট : ২০)
সংগৃহীত ছবি
বর্তমান বিএনপি সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে তরুণদের ভাগ্যোন্নয়নের দিকে বেশ জোর দিয়েছে। তাদের নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা বলেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট পেশ করবেন, তাতে দেশের তরুণরাও বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাদের জন্য নতুন বাজেটে থাকবে একগুচ্ছ প্রস্তাব। অর্থাৎ আগামী বাজেটে থাকছে তারুণ্যের ছোঁয়াও। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তরুণ উদ্যোক্তা ও ডিজিটাল খাতকে ঘিরে বেশ কয়েকটি উদ্যোগের কথা উল্লেখ থাকবে। এর মধ্যে রয়েছে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা বা তহবিল, দক্ষতা উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, ডিজিটাল ও সৃজনশীল শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উদ্যোগ, বিভিন্ন শহরে ক্রিয়েটিভ হাব বা কাজের যৌথ কেন্দ্র স্থাপন। এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে বলে আলোচনায় বলা হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে তরুণদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি প্রস্তাবনা রাখা হচ্ছে। বাজেটের খসড়া নথি ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে পাঁচটি খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তরুণদের জন্য, তার মধ্যে রয়েছে সৃজনশীল অর্থনীতিতে করছাড়। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাত ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কর অব্যাহতি সুবিধা পায়। নতুন বাজেটে এই সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো এবং এর আওতায় ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন, গেম ডেভেলপমেন্ট, অ্যানিমেশন, মিউজিক প্রোডাকশন, ডিজাইন সার্ভিস ও ফ্রিল্যান্সিংকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

আগামী বাজেটে তরুণদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইন্যান্স তহবিল রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে স্টার্টআপ ও ইনোভেশন খাতের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৫০ কোটি টাকার রিফাইন্যান্স স্কিমে সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা থাকবে। এই তহবিলে সুদের হার কম এবং জামানত শিথিল। বাজেটে এই তহবিলের আকার বাড়ানোর প্রস্তাবও থাকছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তরুণদের জন্য ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ বা ইনোভেশন জোন তৈরির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ করার প্রস্তাব আছে। এসব হাবে হাইস্পিড ইন্টারনেট, বিদ্যুতের ব্যাকআপ, হাই-এন্ড কম্পিউটার ও ভিডিও এডিটিং সুবিধা থাকবে। তরুণরা নামমাত্র ভাড়ায় কাজের জায়গা পাবে। ভারতের ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া হাব’ ও ইন্দোনেশিয়ার ‘বেকরাফ হাব’ মডেলে এটি করা হবে।
তরুণদের জন্য নতুন বাজেটে দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের ব্যবস্থাও রাখা হবে। বিশেষ করে কারিগরি শিক্ষা অধিদফতর ও যুব উন্নয়ন অধিদফতরের মাধ্যমে গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, থ্রিডি অ্যানিমেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং ও মিউজিক প্রোডাকশনের ওপর ৩ থেকে ৬ মাসের কোর্স চালুর প্রস্তাব আছে। সরকারি ভর্তুকিতে কোর্স ফি কম রাখা হবে।

এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তরুণদের জন্য রফতানি প্রণোদনার ব্যবস্থাও রাখা হবে। গার্মেন্টস ও কৃষিপণ্যের মতো সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, গেম ও অ্যানিমেশন রফতানির ক্ষেত্রেও ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব আছে। এর ফলে পেপাল, ফাইভার, আপওয়ার্ক থেকে আসা ডলারের ওপর উদ্যোক্তারা বাড়তি সুবিধা পাবেন।

ইউএনসিটিএডির রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৪ সালে বিশ্বে সৃজনশীল পণ্য ও সেবার বাণিজ্য ২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশ আসে সিনেমা, মিউজিক, সফটওয়্যার ও ডিজাইন থেকে। যুক্তরাজ্যে এই খাত জিডিপিতে ৬ শতাংশ অবদান রাখে। ফিলিপাইনে ৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জিডিপি হিসাবে এখনও ‘ক্রিয়েটিভ’ খাতের আলাদা কোড নেই। ফলে সরকারি হিসাবে এই খাত অনেকটাই অদৃশ্য। বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য এই অদৃশ্য খাতকে দৃশ্যমান করা।

আগামী বাজেটে তরুণদের জন্য ক্রিয়েটিভ ইকোনমির ওপরেও জোর দেওয়া হবে। বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতির সংজ্ঞায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। প্রথাগত শিল্প বা ভারী কলকারখানার বাইরে গিয়ে যে নতুন অর্থনৈতিক ধারার জয়জয়কার শোনা যাচ্ছে, তার নামই হলো ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ বা সৃজনশীল অর্থনীতি। বাংলাদেশে একে সহজ বাংলায় কোদালের পাশে ল্যাপটপ বলা হচ্ছে, যা আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

সৃজনশীল অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো মেধা, সৃজনশীলতা, মেধাস্বত্ব এবং প্রযুক্তি। আগে সম্পদ বলতে শুধু জমি বা কাঁচামালকে বোঝানো হতো, কিন্তু এখন ব্যক্তির চিন্তা, উদ্ভাবন এবং ডিজিটাল দক্ষতা সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন এবং ই-কমার্সের যুগে এই অর্থনীতিই ভবিষ্যতের মেরুদণ্ড হয়ে উঠছে।

বর্তমানে প্রথাগত শ্রমের সঙ্গে প্রযুক্তির ডিজিটাল শক্তিকে যুক্ত করে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। এই মডেলটি বেকারত্ব দূরীকরণে এক শক্তিশালী হাতিয়ার। শিক্ষিত তরুণরা কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে ঘরে বসে ফ্রিল্যান্সিং বা ছোট উদ্যোগের মাধ্যমে বৈশ্বিক আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন। এটি গ্রামীণ জনপদকেও ডিজিটাল অর্থনীতির মূলস্রোতে নিয়ে আসছে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি কেবল পুঁজিবাদের নতুন রূপ নয়; এটি মেধা ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে একটি স্মার্ট ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের পথ। আমাদের পুরোনো ভিত্তিগুলোকে নতুন প্রযুক্তির ‘ল্যাপটপ’ দিয়ে শক্তিশালী করতে পারলেই আমরা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারব। এ সমন্বয়ই হলো আগামীর টেকসই উন্নয়নের মূলমন্ত্র।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘বাংলাদেশের জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে হলে প্রচলিত চাকরির বাইরে ভাবতে হবে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমি সেই বিকল্প। তরুণরা এখন মোবাইল ও ল্যাপটপ দিয়ে নিজেরাই চাকরি তৈরি করছে। সরকারের দায়িত্ব তাদের পথের কাঁটা সরানো।’

তিনি বলেন, সরকার এনএসডিএর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের ‘ক্রিয়েটিভ স্কিল সার্টিফিকেশন’ চালু করবে। পাশাপাশি ক্রিয়েটিভ জোন তৈরি করা হবে, যেখানে ট্যাক্স ছাড় ও দ্রুত ইন্টারনেট সুবিধা থাকবে। আগামী বাজেটে তরুণদের জন্য এ ধরনের নানা বিষয়ে প্রাধান্য দেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ। এই জনসংখ্যাগত সুবিধাকে কাজে লাগাতে হলে প্রচলিত চাকরির বাইরে নতুন অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করা জরুরি। তাদের মতে, সৃজনশীল অর্থনীতি শুধু বিকল্প কর্মসংস্থান নয়, বরং একটি সম্ভাব্য বড় রফতানি খাত হিসেবেও বিকশিত হতে পারে। একই সঙ্গে তারা বলছেন, দক্ষতা উন্নয়ন, নীতি সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ছাড়া এই খাত টেকসই হবে না।

এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই এখন তরুণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে বাজেট আসছে, তাতে অবশ্যই তরুণদের গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের বাদ রেখে পরিকল্পনা করলে সফলতা আসবে না। তরুণরা আর শুধু চাকরির জন্য বসে নেই, তারা নিজেরাই চাকরি তৈরি করছে। সরকারের কাজ এখন তাদের সহায়তা করাÍ বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক রাখা, ইন্টারনেটের গতি বাড়ানো, ব্যাংক ঋণ নিতে সহায়তা করা। সেটি করতে পারলে আগামী ১০ বছর পর রফতানি তালিকায় গার্মেন্টসের পাশে ফ্রিল্যান্সিং, গেমিং আর ডিজাইন সার্ভিসও লেখা থাকবে।’

বাজেটের আকার : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পরিকল্পনা করেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় এটি ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আদায় করবে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তারপরও ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক ঋণ ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি, ব্যাংক ঋণ ১ লাখ ১২ হাজার কোটি এবং ব্যাংকবহির্ভুত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

অর্থবিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক অবস্থা, বৈশ্বিক চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ভারসাম্য আনার চ্যালেঞ্জ মাথায় রেখেই বাজেট সাজানো হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটি একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট। কিন্তু দেশের অর্থনীতিকে নতুন মাইলফলকে নিতে হলে উচ্চাভিলাষ দরকার। আমরা মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চাই এবং প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নিতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় আমরা ১৩টি ইস্যুকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছি। এর মধ্যে খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বাস্তবায়ন এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ অন্যতম।’

আরবিএন 



  বিষয়:   প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান  বাজেট 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: