চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১১ মাস পার হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আশানুরূপ অগ্রগতি নেই। বরং জমি অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল প্রকল্প পরিকল্পনা, দরপত্রের জটিলতা ও ঠিকাদারদের দায়হীনতার কারণে জননিরাপত্তা ও সেবা-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এডিপি পর্যালোচনা সভার তথ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের আওতায় চলমান ২৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের গড় আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ৭ শতাংশ।
সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এডিপি পর্যালোচনা সভায় প্রকল্পভিত্তিক অগ্রগতি পর্যালোচনায় উঠে এসেছে উদ্বেগজনক এ চিত্র। সংশ্লিষ্টরা জানান দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে এসব প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়বে এবং কাঙ্ক্ষিত জনসেবা থেকে বঞ্চিত হবে সাধারণ মানুষ।
সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২৫টি প্রকল্পের জন্য মোট ২ হাজার ৫৩৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও গত জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ৮৫ কোটি ২৪ লাখ টাকা। তবে মে মাস পর্যন্ত ব্যয়ের পরিমাণ আরও বেশি হলেও সঠিক হিসাব এখনও পাওয়া যায়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় চলমান প্রকল্পগুলোর অন্যতম হলো দেশের ১০৭টি থানার প্রশাসনিক কাম ব্যারাক ভবন নির্মাণ প্রকল্প। প্রায় ১ হাজার ৬২৪ কোটি টাকার এই প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি বর্তমানে মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাতটি থানার জন্য এখনও জমি চূড়ান্ত করা যায়নি। কোথাও নকশা অনুমোদন, কোথাও ভূমি হস্তান্তর এবং কোথাও স্থানীয় জটিলতার কারণে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পের অবস্থাও অত্যন্ত হতাশাজনক। প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি মাত্র প্রায় ১ শতাংশ। যদিও এই প্রকল্পের আওতায় জাপান সরকারের সহায়তায় ১১ ধরনের মোট ৪৭০টি আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব সরঞ্জাম তিন ধাপে বাংলাদেশে আসার কথা এবং চলতি বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে সরঞ্জাম না আসা পর্যন্ত প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ কম।
ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধির আরেকটি প্রকল্পের কাজও চলছে ধীরগতিতে। প্রকল্পের আওতায় জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে স্থানীয়ভাবে নির্ধারিত তিন সেটের মধ্যে দুটি এবং বিদেশি উৎসের ৮টি সেট সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সে আধুনিক ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনের কাজও চলমান রয়েছে।
র্যাব ফোর্সেসের আভিযানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি প্রকল্পটি মন্ত্রণালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় ৩টি জিপ, ১০০টি ডাবল কেবিন পিকআপ এবং ৬০টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত মাইক্রোবাস সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত জানুয়ারিতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে যানবাহন কেনার প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়। পরে অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন দিলেও প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি এখনও ৫০ শতাংশেরও কম। ভৌত অগ্রগতি ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে র্যাবের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকরণ প্রকল্প তুলনামূলকভাবে আশাব্যঞ্জক অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি, নজরদারি সরঞ্জাম ও বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি সংগ্রহের এই প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম সফল প্রকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কারা অধিদফতরের প্রকল্পগুলোতেও স্থবিরতা স্পষ্ট। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ প্রকল্পে চরম অব্যবস্থাপনা দেখা গেছে। ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে গত বছরের নভেম্বর থেকে কাজ বন্ধ থাকায় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ৫৪ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩ কোটি টাকা। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে দেয়াল নির্মাণ নিয়ে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ দেখা দেওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তবে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার ও জামালপুর জেলা কারাগার পুনর্নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে চলছে বলে সভায় জানানো হয়।
সভায় জানানো হয় ৯ হাজার ৩৮ কোটি টাকার ই-পাসপোর্ট প্রকল্পে জানুয়ারি পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা (১.৭৮ শতাংশ)। বিশেষ করে ভারত ও রাশিয়ায় ই-পাসপোর্ট সেবা চালুর ক্ষেত্রে কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া আনসার ও ভিডিপির ৪০টি অস্ত্রাগার নির্মাণ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি ৬০ শতাংশ।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের ৫০টি ফায়ার ও রেসকিউ অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় প্রকল্পে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। দ্বিতীয় দফা দরপত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান ডিপিপিতে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৩৯ শতাংশ বেশি মূল্য প্রস্তাব করায় মন্ত্রণালয় দরপত্র বাতিল করতে বাধ্য হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্প সংশোধন করে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তবু প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি এখনও মাত্র ১ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটির জন্য প্রায় ৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। দেশের ২০টি স্থানে ফায়ার স্টেশন স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ১২টি নতুন স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও অধিকাংশ স্থানে জমি জটিলতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল দেবীদ্বার, মির্জাপুর ও গাজীপুরে জমি-সংক্রান্ত সমস্যা নেই বলে জানা গেছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের উন্নয়ন ব্যয়ের চিত্র সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ঢাকা কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র সম্প্রসারণ প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। ফলে প্রকল্পে কোনো ব্যয় হয়নি। অন্যদিকে সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি নতুন হওয়ায় জমি যাচাই, নকশা সংশোধন এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সময় লাগছে। বিশেষ করে রংপুর বিভাগে জমি-সংক্রান্ত জটিলতা এখনও নিরসন হয়নি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইতিবাচক অবস্থানে রয়েছে বিজিবির ৭৩টি কম্পোজিট বর্ডার আউটপোস্ট (বিওপি) নির্মাণ প্রকল্প। এর ভৌত অগ্রগতি ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ২ হাজার ৩১৪ কোটি ৮২ লাখ টাকার কোস্ট গার্ডের জাহাজ সংগ্রহ প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি মাত্র প্রায় ১ শতাংশ। যদিও বাহিনীর লজিস্টিক ও ফ্লিট মেইনটেন্যান্স সুবিধা উন্নয়ন প্রকল্পে অগ্রগতি ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
এডিপি পর্যালোচনা সভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির কারণে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রকল্প পরিচালকদের প্রতি কঠোর বার্তা দিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, যে প্রকল্পের অর্থ চলতি অর্থবছরে ব্যয় করা সম্ভব হবে না, তা দ্রুত সংশোধিত এডিপিতে ফেরত দিতে হবে। একই সঙ্গে প্রকল্প এলাকায় নিয়মিত পরিদর্শন, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে ঠিকাদারের গাফিলতি বা নকশা জটিলতার কারণে যেন কোনো প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় না বাড়ে, সে বিষয়ে নিয়মিত তদারকির নির্দেশ দেন।
আরবিএন