যুদ্ধে ব্যয় ১৩৮ বিলিয়ন ডলার, চরম বিপর্যয়ের মুখে ইসরায়েলের অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

টানা কয়েক বছর ধরে চলা বহুমুখী যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতি ইসরায়েলের অর্থনীতিকে এক

2026-06-07T12:38:39+00:00
2026-06-07T12:38:39+00:00
 
  রবিবার, ৭ জুন ২০২৬,
২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধে ব্যয় ১৩৮ বিলিয়ন ডলার, চরম বিপর্যয়ের মুখে ইসরায়েলের অর্থনীতি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: রোববার, ৭ জুন, ২০২৬, ১২:৩৮ পিএম   (ভিজিট : ১৩)
সংগৃহীত ছবি
টানা কয়েক বছর ধরে চলা বহুমুখী যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার উগ্র জাতীয়তাবাদী নীতি ইসরায়েলের অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দেশকে প্রাচীন গ্রিসের যুদ্ধপ্রিয় নগররাষ্ট্র ‘স্পার্টা’র আধুনিক সংস্করণ বা ‘সুপার-স্পার্টা’ বানানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে সামরিক খাতের এই রেকর্ড বরাদ্দ সাধারণ ইসরায়েলিদের জীবনযাত্রার ওপর মারাত্মক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার ফলে দেশটির শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতগুলো এখন চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন।

ব্যাংক অব ইসরায়েলের গভর্নর আমির ইয়ারন তেল আবিবের উত্তরে হার্জলিয়াতে আয়োজিত এক সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য প্রকাশ করেছেন। তার প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে শুরু হওয়া আন্তঃসংযুক্ত আঞ্চলিক সংঘাতের পেছনে চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ নাগাদ ইসরায়েলের মোট খরচ দাঁড়িয়েছে ৪০৫ বিলিয়ন শেকেল— আমেরিকান ডলারে যার পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার ৮০০ কোটি (১৩৮ বিলিয়ন) ডলার।

গভর্নর আমির ইয়ারন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এটি একটি বিশাল ও ভয়ানক অঙ্ক, যা আমাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১৭ শতাংশেরও বেশি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ইরানের ওপর ইসরায়েলের যে বিমান হামলা শুরু হয়েছিল, তা গত ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত মাত্র কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েলি কোষাগার থেকে অতিরিক্ত ৩৫ বিলিয়ন শেকেল (১২ বিলিয়ন ডলার) গ্রাস করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাবে এই তথ্য উঠে এসেছে। গত মার্চ মাসের শেষে পাস হওয়া ২০২৬ সালের জাতীয় বাজেটে দেখা যায়, ২০২৩ সালের অক্টোবরের তুলনায় দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই যুদ্ধের বিশাল খরচ মেটাতে ২০২৪ এবং ২০২৫ সালজুড়ে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে নেতানিয়াহু সরকার। যার ফলে যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে যেখানে ইসরায়েলের পাবলিক ডেট বা রাষ্ট্রীয় ঋণ জিডিপির ৬০ শতাংশ ছিল, তা এখন লাফিয়ে বেড়ে ৬৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর কর ও সামাজিক নিরাপত্তা শুল্কের হার বহু গুণ বৃদ্ধি করেছে।

জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক এস্তেবান ক্লোর ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ইসরায়েলিরা এখন এই যুদ্ধের জন্য ‘ডাবল ট্যাক্স’ বা দ্বিগুণ মূল্য পরিশোধ করছে। প্রথমত, সরকার প্রতিরক্ষা বাজেট জোগাতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং অবকাঠামো খাতের মতো জনকল্যাণমূলক খাতগুলো থেকে একের পর এক বরাদ্দ কর্তন করছে। ফলে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ও শিক্ষা ব্যবস্থার মান মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দ্বিতীয়ত, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে লাখো রিজার্ভ সৈন্যকে নিয়মিত কর্মক্ষেত্র ছেড়ে সেনাবাহিনীতে নিয়োজিত রাখায় দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট (আইডিআই) পরিচালিত এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৩১ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক স্বীকার করেছেন- যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তাদের মাসিক আয় ও মজুরি ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এই ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লেগেছে নিম্ন আয়ের মানুষ এবং স্বনির্ভর ব্যবসায়ীদের ওপর।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিভাগের উপ-প্রধান তামার লেভি-বোনহ একে একটি ‘ট্রমা ইকোনমি’ বা ট্রমা-চালিত অর্থনীতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ৭ অক্টোবরের ব্যর্থতা ও মানসিক আঘাতকে পুঁজি করে দেশের সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট (নিরাপত্তা বাহিনী) প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত তহবিলের দাবি তুলছে। কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীকে বুঝতে হবে, দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান ধ্বংস করে সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করা সম্ভব নয়।

অর্থনীতিবিদদের এই সতর্কবার্তাকে তোয়াক্কা না করে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছেন। এর আগে তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছিলেন, টিকে থাকার স্বার্থে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যের ‘সুপার-স্পার্টা’ হতেই হবে। বর্তমানে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান এবং ইরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে নেতানিয়াহুর এক ধরনের নীতিগত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই কারণে নেতানিয়াহু আমেরিকার সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সম্পূর্ণ ‘স্বনির্ভর’ হওয়ার চেষ্টা করছেন।

এই স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে তিনি আগামী এক দশকে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প ও আকাশসীমায় একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখতে ৩৫০ বিলিয়ন শেকেল বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন।

অর্থনীতিবিদরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, এই ধারা অব্যাহত থাকলে প্রতিরক্ষা বাজেট জিডিপির ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে ইসরায়েলে এমনিতেই ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য সবচেয়ে প্রকট, আর এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ সেই ক্ষতকে আরও উসকে দিচ্ছে। ইসরায়েলি ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ সমীক্ষা বলছে, যুদ্ধকালীন এই চরম অর্থনৈতিক মন্দার কারণে দেশটিতে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করা শিশুর সংখ্যা ২৭.৬ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ইতোমধ্যে ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অবরুদ্ধ গাজা ও লেবাননের পাশাপাশি অর্থনৈতিক এই যুদ্ধ এখন খোদ ইসরায়েলের অভ্যন্তরেও এক নীরব দুর্ভিক্ষ ও সামাজিক অস্থিরতার জন্ম দিচ্ছে।


/কহু


  বিষয়:   ইসরায়েল  ডলার  অর্থনীতি 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: