পৃথিবীর এক অবাক বিস্ময়ের নাম সমুদ্র। সমুদ্র নিয়ে মানুষের কৌতূহলের শেষ নেই। একইসঙ্গে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে মানুষের রয়েছে কিছু ভুল ধারণাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়া নানা বিশ্বাসের কারণে এসব ভুল ধারণার জন্ম।
সমুদ্রের পানি পুরোপুরি নীল
সমুদ্রের দিকে তাকালে মনে হয়, বিশাল জলরাশি যেন নীল রঙে রাঙানো। তাই অনেকেই মনে করেন, সমুদ্রের পানির নিজস্ব রং নীল। বাস্তবে বিশুদ্ধ পানি প্রায় বর্ণহীন। সমুদ্র নীল দেখায় মূলত সূর্যালোকের কারণে। সূর্যের আলোতে থাকা বিভিন্ন রঙের মধ্যে লাল, কমলা ও সবুজ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো পানি বেশি শোষণ করে নেয়, অন্যদিকে নীল আলো তুলনামূলক বেশি প্রতিফলিত হয়। ফলে দূর থেকে সমুদ্রকে নীল দেখায়। তবে সব সমুদ্র সবসময় নীল দেখায় না। কোথাও সবুজাভ, কোথাও ধূসর, আবার কোথাও ফিরোজা রঙেরও দেখা মেলে। পানির গভীরতা, পানিতে থাকা বিভিন্ন জৈব ও অজৈব উপাদান, সূর্যালোকের প্রতিফলন এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে সমুদ্রের রঙ বদলে যেতে পারে।
সমুদ্রের তলদেশ সম্পূর্ণ সমতল
অনেকের ধারণা, সমুদ্রের নিচে বিশাল সমতল ভূমি রয়েছে, যেখানে শুধু পানি আছে। প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রতল পৃথিবীর স্থলভাগের মতোই বৈচিত্র্যময়। সেখানে রয়েছে পর্বতমালা, উপত্যকা, আগ্নেয়গিরি, খাদ, বিস্তীর্ণ মালভূমিসহ অনেককিছু। পৃথিবীর দীর্ঘতম পর্বতমালাগুলোর একটি মিড ওশান রিজ সমুদ্রের নিচে অবস্থিত, যা প্রায় ৬৫ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ছাড়া প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা ট্রেঞ্চ পৃথিবীর গভীরতম স্থান, যার গভীরতা প্রায় ১১ কিলোমিটার।
হাঙরই সমুদ্রের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী
সিনেমা ও টেলিভিশনের কারণে হাঙরকে সমুদ্রের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রাণী হিসেবে দেখা হয়। ফলে অনেকে মনে করেন, সমুদ্রে নামলেই হাঙরের আক্রমণের ঝুঁকি থাকে। বাস্তবতা আসলে ভিন্ন। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর হাঙরের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা অত্যন্ত কম। অধিকাংশ হাঙর প্রজাতিই মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। এমনকি হাঙর সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সমুদ্র সম্পর্কে আমরা সব জানি
প্রযুক্তির উন্নতির কারণে অনেকের মনে হতে পারে, বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের প্রতিটি কোণ ইতোমধ্যে জেনে ফেলেছেন। কিন্তু সত্য হলো, মহাকাশের চাঁদের পৃষ্ঠ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রে সমুদ্রের গভীর তলদেশের চেয়েও বেশি। বিজ্ঞানীরা এখনও সমুদ্রের বিশাল অংশ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেননি। গভীর সমুদ্রে এমন অসংখ্য প্রাণী রয়েছে, যাদের অস্তিত্ব মাত্র কয়েক দশক আগে আবিষ্কৃত হয়েছে। এখনও নতুন নতুন প্রজাতি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
সমুদ্রের সম্পদ কখনও শেষ হবে না
বিশাল জলরাশি দেখে অনেকেই মনে করেন সমুদ্রের মাছ, প্রবাল কিংবা অন্যান্য সম্পদ অফুরন্ত। কিন্তু বাস্তবে অতিরিক্ত মাছ শিকার, প্লাস্টিক দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি সামুদ্রিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিশ্বের বহু অঞ্চলে মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। প্রবালপ্রাচীর, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল, ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে সমুদ্রের অনেক সম্পদ হারিয়ে যেতে পারে।
সমুদ্রকে আমরা প্রতিদিন দেখি, কিন্তু তাকে পুরোপুরি জানি না। পৃথিবীর প্রায় ৭১ শতাংশ অংশজুড়ে বিস্তৃত এই বিশাল জলরাশির গভীরে লুকিয়ে আছে অগণিত রহস্য, বিস্ময় এবং বৈজ্ঞানিক প্রশ্ন। এই বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রকে বোঝার জন্য বাস্তব তথ্য জানা জরুরি। সমুদ্র শুধু জীববৈচিত্র্যের আধারই নয়, বরং মানবসভ্যতার অস্তিত্বের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সমুদ্র আমাদের খাদ্য দেয়, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ করে, অক্সিজেন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে এবং কোটি কোটি প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। তাই সমুদ্র সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন এবং এর সংরক্ষণে সচেতন হওয়া সময়ের দাবি।
/মহু