স্ক্যানের মাধ্যমে কম্পিউটারে সংরক্ষণের পর বইগুলো ফেলে দেওয়া বা ধ্বংস করা হয়। ছবি : প্রতীকী
একটি ভালো বই পাঠককে ঘরে বসেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘুরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে বই পড়ার অভ্যাস যেমন কমছে, তেমনি এবার সামনে এসেছে আরও উদ্বেগজনক এক ঘটনা। রে ব্র্যাডবারির বিখ্যাত বিজ্ঞান কল্পকাহিনি ফারেনহাইট ৪৫১-এ বই ধ্বংসের যে ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল, বাস্তবেও তার সঙ্গে মিল রয়েছে এমন এক ঘটনা সামনে এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) তৈরির লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ ছাপা বই সংগ্রহ করে স্ক্যান করার পর সেগুলো ধ্বংস করে ফেলছে কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
বর্তমানে শক্তিশালী এআই মডেল তৈরির জন্য উচ্চমানের তথ্যের চাহিদা ব্যাপক। ইন্টারনেটের তথ্য ব্যবহার করলে কপিরাইট সংক্রান্ত মামলা ও আইনি জটিলতার ঝুঁকি থাকে। তাই অনেক প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে বাজার থেকে নতুন ও পুরোনো বই সংগ্রহ করে সেগুলো ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তর করছে। এই কাজের জন্য বইয়ের বাঁধাই কেটে প্রতিটি পৃষ্ঠা আলাদা করা হয়, স্ক্যানের মাধ্যমে কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরে বইগুলো ফেলে দেওয়া বা ধ্বংস করা হয়।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ৪০৪ মিডিয়া জানিয়েছে, এআই কোম্পানিগুলো সাধারণত নিজেরা বই সংগ্রহ করে না। তারা বিশেষায়িত এজেন্সির মাধ্যমে গোপনে বাজার থেকে লাখ লাখ বই কিনে থাকে, যাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচয় প্রকাশ না পায়।
উন্নত এআই প্রশিক্ষণের জন্য পুরনো বইগুলো কার্যকর। ছবি : প্রতীকী
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৩ সালে জেনারেটিভ এআই জনপ্রিয় হওয়ার পর ইন্টারনেটে এআই দিয়ে তৈরি নিম্নমানের কনটেন্ট দ্রুত বেড়েছে। ফলে, তার আগের সময়ে প্রকাশিত বইগুলোর মূল্য এখন অনেক বেশি। কারণ, এসব বইতে মানুষের লেখা নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত তথ্য রয়েছে, যা উন্নত এআই প্রশিক্ষণের জন্য অত্যন্ত কার্যকর।
এই চাহিদার প্রভাব পড়েছে পুরনো বইয়ের বাজারেও। এক বই বিক্রেতার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যেখানে সপ্তাহে প্রায় ২০টি বই বিক্রি হতো, এখন এআইসংশ্লিষ্ট ক্রেতাদের কারণে সেই সংখ্যা কয়েক’শতে পৌঁছেছে। এতে ব্যবসায় লাভ হলেও তিনি উদ্বিগ্ন। তার আশঙ্কা, স্ক্যানের পর ধ্বংস করে দেওয়ার কারণে অনেক দুর্লভ ও ঐতিহাসিক বই পৃথিবী থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।
তিনি জানান, অবিক্রীত পুরনো বই বিক্রি হওয়ায় আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, বিশেষ করে বিদেশি ভাষার বইয়ের ক্ষেত্রে। তবে, বইগুলোর শেষ পরিণতি তাকে ব্যথিত করে এবং দুর্লভ বই ধ্বংস হওয়া তিনি সমর্থন করেন না।
এই পদ্ধতির একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের‘প্রজেক্ট পানামা’। এই প্রকল্পের আওতায় প্রতিষ্ঠানটি লাখ লাখ বই স্ক্যান করার পর মূল কপিগুলো স্থায়ীভাবে ধ্বংস করেছিল।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি কপিরাইট মামলায় সান ফ্রান্সিসকোর এক বিচারক রায় দেন, বৈধভাবে কেনা বই স্ক্যান করে ডিজিটাল কপি তৈরি এবং পরে মূল বই ধ্বংস করা আইনসম্মত। পরবর্তীতে ওপেনএআই ও মেটাসংক্রান্ত মামলাগুলোতেও একই ধরনের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়।
তবে, সব ক্ষেত্রে একই রায় হয়নি। ক্লড এআই মডেল প্রশিক্ষণে অবৈধ বা পাইরেটেড বই ব্যবহারের অভিযোগে অ্যানথ্রোপিকের বিরুদ্ধে ১.৫ বিলিয়ন ডলারের জরিমানা অনুমোদন করেন এক বিচারক। ফলে, ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার লেখককে বইপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ডলার করে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইলন মাস্কও। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, স্পেসএক্সের এআই টিমকে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যেন লাইব্রেরির দুর্লভ বইয়ের মলাট কেটে ধ্বংস না করা হয়। বই অক্ষত রেখেই অপেক্ষাকৃত জটিল পদ্ধতিতে স্ক্যান করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
এই উদ্যোগের সূচনা প্রায় দুবছর আগে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে অ্যানথ্রোপিক গুগল বুকসের সাবেক কর্মকর্তা টম টার্ভিকে নিয়োগ দেয়। তার দায়িত্ব ছিল বিশ্বের বিভিন্ন বই সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানের এআই মডেলের তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করা।
বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য শিক্ষক ও পুরোনো বই বিক্রেতা মার্সাল ফন্ত ই এস্পির মতে, ‘এআই কোম্পানিগুলো এখন মানসম্মত তথ্যের সংকটে রয়েছে। ইন্টারনেটে এআই নির্মিত নিম্নমানের কনটেন্টের আধিক্যের কারণে মানুষের লেখা পুরনো ও নির্ভরযোগ্য বই ই এখন তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।’
যদিও বর্তমান আইনে বৈধভাবে কেনা বই স্ক্যান করে ধ্বংস করার সুযোগ রয়েছে, তবু প্রযুক্তি অঙ্গনের অনেকেই এই প্রবণতাকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন না। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টরি এআইয়ের প্রধান নির্বাহী মাতান গ্রিনবার্গের মতে, ‘মানুষের সৃষ্ট একটি মূল্যবান জ্ঞানভান্ডারকে যান্ত্রিকভাবে ধ্বংস করার মধ্যে মানবতাবিরোধী মানসিকতার প্রকাশ রয়েছে।’
তার ভাষায়, ইতিহাসে বই ধ্বংসকারীদের কখনোই ভালো চোখে দেখা হয়নি।