একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খন্দকার নাফিস আহমেদ। রোববার রাতের ঘুমাতে দেরি করলেও পরদিন সকালটা শুরু করতে দেরির সুযোগ নেই। অফিসের দূরত্ব বেশি হওয়ায় গাড়ি ধরতে তাকে সকাল ৬টায় বাসা থেকে বের হতে হয়। সকাল ৫টা ২০ মিনিটে অ্যালার্ম বাজার পর চোখ মেলতেই নাফিসের মনে হলো, শরীর যেন বিছানার সঙ্গে আটকে আছে। মাথা ভার, চোখে জ্বালাপোড়া, কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারছেন না। তারপরও উঠতে হলো। অফিসের পথে নিজেকে সান্ত্বনা দিলেন—‘আজ একটু কষ্ট হোক, শুক্রবার তো ছুটি। সেদিন অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে নেব।’
এমন অভিজ্ঞতা শুধু নাফিসের নয়। কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে পর্যাপ্ত ঘুমের সুযোগ না পাওয়ায় অনেকেই ছুটির দিনে বেশি সময় ঘুমিয়ে সেই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করেন। কেউ দুপুর পর্যন্ত ঘুমান, আবার কেউ আগের রাতেই তুলনামূলক দ্রুত ঘুমানোর চেষ্টা করেন।
কিন্তু ছুটির দিনে দীর্ঘ সময় ঘুমালেই কি সপ্তাহজুড়ে জমে থাকা ঘুমের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হয়? নাকি নিয়মিত ঘুমের অভ্যাসের বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত ঘুম শরীরের ঘুমের ছন্দেই প্রভাব ফেলে?
সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘুমের ঘাটতি পূরণে কিছুটা বাড়তি ঘুম উপকারী হতে পারে। এমনকি এক রাত খুব কম ঘুমানোর পর পরের রাতে মাত্র দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুমও শরীরকে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাহায্য করতে পারে। তবে এর মানে এই নয়, সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি একদিনে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মানুষ নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ একই কাজ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজন হয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। কিন্তু বাস্তবে সবসময় এতটা ঘুমানো সম্ভব হয় না।
প্রশ্ন হলো—পুরো সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি কি সত্যিই সপ্তাহান্তে কয়েক ঘণ্টা বেশি ঘুমিয়ে পূরণ করা যায়? আর কতটা বাড়তি ঘুম শরীরের জন্য উপকারী?
বেশি সময় ঘুমালে কী হয়
সপ্তাহান্তে বেশি ঘুমানোর প্রভাব বুঝতে ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী দুটি প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ।
স্লিপ হোমিওস্ট্যাট : যত বেশি সময় জেগে থাকা হয়, তত বেশি ঘুমের চাপ জমে। এটিই ‘স্লিপ ডেবট’ বা ঘুমের ঋণ।
দেহঘড়ি : আলো-অন্ধকার, তাপমাত্রা, খাবারের সময় ও শারীরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেহের স্বাভাবিক ছন্দ নিয়ন্ত্রিত হয়।
এই দুই প্রক্রিয়া ঠিকভাবে কাজ করলে ঘুম ও শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বজায় থাকে। তবে অতিরিক্ত ঘুমে ছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। সকালে বেশি ঘুমালে রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়, ফলে আবার ঘুমের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
যেমন, শুক্রবার সকালে বেশি ঘুমালে রাতে দেরিতে ঘুম আসতে পারে। শনিবার সকাল ৬টায় উঠতে হলে পর্যাপ্ত ঘুম নাও হতে পারে। এভাবেই শুরু হয় ঘুমের ঘাটতির চক্র।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের স্লিপ ল্যাবের পরিচালক মেলিন্ডা ক্যাসমেন্টের মতে, এটি অনেকটা প্রতি সপ্তাহে একবার টাইম জোন পরিবর্তনের মতো। তবে ঘুমের ঘাটতি পূরণে বাড়তি ঘুম কিছু ক্ষেত্রে উপকারীও হতে পারে।
বাড়তি ঘুম কতটা কাজে দেয়
এক রাতে মাত্র ২ ঘণ্টা ঘুমানোয় শরীরে দুই ধরনের শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা বেড়ে যায়।পরের রাতে ৮ ঘণ্টা ঘুমেও এ মাত্রা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।তবে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা ঘুমে মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।অন্য এক গবেষণায় ১১ জন পুরুষের ঘুম ৮ থেকে ৪ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়। ছয় রাতেই গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ ও ইনসুলিনের কার্যকারিতায় নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়।পরে তাদের ছয় রাত ১২ ঘণ্টা করে ঘুমানোর সুযোগ দিলে শারীরিক সূচকগুলো স্বাভাবিক হয়।কম ঘুমানো মানুষের জন্য দিনের বেলার ছোট ন্যাপও উপকারী হতে পারে।
ঘুমের ঘাটতি থাকলে কী হয়
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক সপ্তাহ বা মাস নিয়মিত কম ঘুমালে মনোযোগ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও স্থানিক দিকনির্ণয়ের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ছুটির দিনে বেশি ঘুমালেও সব প্রভাব পুরোপুরি কাটে না।
সুইডেনের এক গবেষণায় ৪০ হাজারের বেশি মানুষকে ১৩ বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়।
৬৫ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে রাতে ৬–৭ ঘণ্টা ঘুমে মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম ছিল।৫ ঘণ্টা বা কম ঘুমে মৃত্যুঝুঁকি ছিল ৬৫ শতাংশ বেশি।সপ্তাহান্তে বাড়তি ঘুম সেই ঝুঁকি কিছুটা কমার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
ঘুমের ঘাটতির সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, ডিমেনশিয়া, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় ২ হাজার ৮০০ মানুষের ওপর গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত কম ঘুমানো ব্যক্তিদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি। তবে ছুটির দিনে প্রতি এক ঘণ্টা বাড়তি ঘুমের সঙ্গে এ ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়।
ঘুমের ‘সুইট স্পট’
‘সুইট স্পট’ হলো সবচেয়ে কার্যকর বা আদর্শ অবস্থা। ঘুমের ক্ষেত্রে এটি এমন পরিমাণ ঘুম, যা ঘাটতি পূরণ করে এবং ক্ষতিকর প্রভাবও কম রাখে।
জার্মানির মিউনিখের ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইকোলজির অধ্যাপক টিল রেনোবার্গ বলেন, ঘুমের ঘাটতি পূরণ করা জরুরি, কারণ ঘুম জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি।
গবেষণাগুলো ইঙ্গিত করে, অনেকের ক্ষেত্রে এক থেকে দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম ঘাটতি পূরণে কার্যকর হতে পারে। তাই ছুটির দিনে কিছুটা বেশি ঘুম উপকারী হলেও দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা জরুরি নয়।
সময়ের আলো/কেএইচও