বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এমন অনেকের নামই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেনি, যাদের ত্যাগ ও সাহস ছাড়া ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস পূর্ণতা পেত না। তেমনই একজন সংগ্রামী নারী ছিলেন ভাষাসৈনিক আয়েশা বেগম, যিনি কিশোরী বয়সেই মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় আয়েশা বেগম ছিলেন নবম শ্রেণির ছাত্রী। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যখন ছাত্রসমাজ রাস্তায় নেমে আসে, তখন তিনিও সাহসের সঙ্গে সেই আন্দোলনে যোগ দেন। বয়সে তরুণী হলেও তার চেতনা ছিল দৃঢ় এবং প্রতিবাদী। ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে এক মাস কারাবরণও করতে হয়েছিল।
ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণের ইতিহাস অনেকটা আড়ালেই থেকে গেছে। অথচ আয়েশা বেগমের মতো নারীরা প্রমাণ করেছিলেন, মাতৃভাষার প্রশ্নে নারী-পুরুষের কোনো বিভাজন নেই। ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন ছিল সমগ্র বাঙালি জাতির আন্দোলন, সেই আন্দোলনে নারী সমাজও সমানভাবে সম্পৃক্ত ছিল। আয়েশা বেগম সেই সাহসী নারীদের অন্যতম প্রতিনিধি। জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি ও চেতনাকে ধারণ করে বেঁচে ছিলেন। তার জীবন নতুন প্রজন্মের অনুপ্রেরণার উৎস। ভাষার জন্য সংগ্রাম কেবল একটি রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের বিষয় নয়; এটি ছিল আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি এবং জাতিসত্তার প্রশ্ন। আয়েশা বেগম সেই চেতনাকেই নিজের জীবন দিয়ে লালন করেছেন।
আয়েশা বেগম কর্মজীবনে মহা হিসাবরক্ষণ অধিদফতরের প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পরও তিনি সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। আজ যখন বাংলা ভাষা বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, তখন আয়েশা বেগমের মতো ভাষাসৈনিকদের অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন। তাদের আত্মত্যাগই আমাদের ভাষার মর্যাদা ও জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে। ভাষাসৈনিক আয়েশা বেগম তাই শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি বাংলা ভাষার জন্য সংগ্রাম, সাহস এবং আত্মমর্যাদার এক উজ্জ্বল প্রতীক।
গতকাল ৬ জুন ৯০ বছর বয়সে অনন্ত পথের যাত্রী হলেন এই লড়াকু নারী। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার দুপ্তারা ইউনিয়নের পাঁচবাড়িয়া গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। তার মৃত্যুতে ভাষা আন্দোলনের একটি জীবন্ত অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
/মহু