প্রতি বছর জুন মাস এলেই দেশজুড়ে বাজেট নিয়ে নানা আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী বা অর্থ উপদেষ্টা নতুন বাজেট পেশ করেন এবং ১ জুলাই থেকে সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়। তবে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, সাধারণ ক্যালেন্ডারের মতো জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর না হয়ে, কেন জুলাই থেকে জুন মাসকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বছর হিসেবে ধরা হয়?
অর্থবছরের ধারণা :
সহজ কথায়, একটি দেশের সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়, ট্যাক্স আদায়, বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রজেক্টের বাস্তবায়ন এবং সামগ্রিক আর্থিক হিসাব-নিকাশের জন্য যে ১২ মাসের চক্র নির্ধারণ করা হয়, তাকেই অর্থবছর বা ফিসক্যাল ইয়ার বলে। আমাদের দেশে এই চক্রটি শুরু হয় ১ জুলাই এবং শেষ হয় পরের বছরের ৩০ জুন। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কালকে ২০২৬-২৭ অর্থবছর হিসেবে গণ্য করা হয়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সূচনা :
জুলাই-জুনভিত্তিক এই হিসাবব্যবস্থার ইতিহাস বেশ পুরোনো। এর সূত্রপাত ঘটেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে এই নিয়মটি চালু ছিল। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলেও একই আর্থিক পঞ্জিকা অনুসরণ করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশও প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিটি বজায় রাখে।
কেন ক্যালেন্ডার বছরের সঙ্গে মিল রাখা হয়নি :
পৃথিবীর সব দেশেই যে জানুয়ারি থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হয়, তা কিন্তু নয়। প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের নিজস্ব আবহাওয়া, ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রশাসনিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে এই সময় নির্ধারণ করে। যেমন— যুক্তরাজ্য ও ভারতে অর্থবছর হিসাব করা হয় এপ্রিল থেকে মার্চ পর্যন্ত, আবার যুক্তরাষ্ট্রে এটি শুরু হয় অক্টোবরে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জুলাই-জুন সময়কালকে দাপ্তরিক কাজের জন্য সবচেয়ে উপযোগী মনে করা হয়েছে।
বাজেট তৈরির পর্যাপ্ত সময় পাওয়া :
একটি দেশের জাতীয় বাজেট প্রণয়ন মোটেও রাতারাতি সম্ভব নয়; এর পেছনে কয়েক মাসের নিবিড় প্রস্তুতি থাকে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকে খরচের চাহিদা আসার পর অর্থ মন্ত্রণালয় তা যাচাই-বাছাই করে। সাধারণত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ চলে এবং জুন মাসে তা সংসদে পাস হয়। ফলে ১ জুলাই থেকে নতুন নিয়মে কাজ শুরু করা সহজ হয়। যদি জানুয়ারি থেকে অর্থবছর শুরু হতো, তবে বছরের শেষের দিকের নানা ছুটি ও প্রশাসনিক ব্যস্ততার কারণে বাজেট তৈরি করা বেশ কঠিন হতো।
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সংযোগ :
বাংলাদেশ মূলত একটি কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। অতীতে দেশের সিংহভাগ আয় ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা কৃষির ওপর নির্ভরশীল ছিল। আমাদের দেশে বোরো ধানসহ প্রধান প্রধান ফসল কাটার মৌসুম সাধারণত এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে শেষ হয়। ফলস্বরূপ, জুন মাসের দিকে এসে দেশের কৃষি উৎপাদন এবং সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের একটি বাস্তব চিত্র সরকারের হাতে আসে। এই হিসাবের ওপর ভিত্তি করে আগামী বছরের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজানো সহজ হতো। বর্তমানে শিল্প ও সেবা খাতের অবদান বাড়লেও, ঐতিহাসিক এই কারণটি এখনো প্রাসঙ্গিক।
উন্নয়নমূলক কাজের সমন্বয় :
সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন এই চক্রের ওপর নির্ভর করে। ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ায় বর্ষা মৌসুমের পরপরই মাঠপর্যায়ে পুরোদমে কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করা যায়। এতে করে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং ফান্ড ছাড় করার প্রক্রিয়াটি একটি সুনির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চলে আসে।
অর্থবছর পরিবর্তনের বিতর্ক ও বর্তমান অবস্থা :
সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রচলিত অর্থবছর পরিবর্তনের ব্যাপারে নানা আলোচনা শোনা যায়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ক্যালেন্ডার বছর বা এপ্রিল-মার্চ অনুযায়ী অর্থবছর নির্ধারণ করলে জুন মাসের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে সরকারি টাকা খরচ করার প্রবণতা বন্ধ হতো। তবে এই পরিবর্তন আনা বেশ জটিল। কারণ এর সাথে কর ব্যবস্থা, ব্যাংকিং সফটওয়্যার, হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি এবং সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো জড়িত। এই বিশাল রূপান্তরের জটিলতা এড়াতেই সরকার এখনো জুলাই-জুন পদ্ধতিটি ধরে রেখেছে।
ইতিহাস, প্রশাসনিক সুবিধা, কৃষির ঐতিহ্য এবং বাজেট তৈরির বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করেই এই জুলাই-জুন অর্থবছর ব্যবস্থাটি গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই নিয়মটি এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি স্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।