ত্রাণ সামগ্রী ও বিশেষ তহবিল বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারি দল এবং বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তীব্র বৈষম্য করা হচ্ছে বলে জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধী দলীয় সদস্যরা। তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু স্পষ্ট করেছেন, মন্ত্রণালয়ের সব ধরণের রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ কোনো রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, বরং সম্পূর্ণ স্থানীয় চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে প্রদান করা হয়।
সোমবার (৮ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে বিরোধী দলের সদস্যরা এই বৈষম্যের বিষয়টি উত্থাপন করেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে এই প্রশ্নোত্তর পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়।
অধিবেশনে রংপুর-৪ আসনের এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন ত্রাণমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, দেশের দুর্যোগের মানচিত্রে কোনো ভৌগোলিক পরিবর্তন এসেছে কি না। তিনি অভিযোগ করেন, গত ৩০ এপ্রিল দুর্যোগ মন্ত্রণালয় থেকে যে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তা কেবল সরকারি দলের সংসদীয় আসনগুলোতেই সীমাবদ্ধ ছিল; বিরোধী দলের সদস্যদের এলাকায় কোনো বরাদ্দ পৌঁছায়নি।
এর জবাবে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন জরুরি কর্মসূচি রয়েছে এবং যখন যেখানে প্রকৃত দুর্যোগ ঘটে, তখন সেখানকার জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে জিআর ক্যাশ ও জিআর রাইস বিতরণ করা হয়। টিআর ও কাবিখা কর্মসূচির ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা চাহিদাপত্র দিলে সেই অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বরাদ্দ দেওয়া হয় এবং আগামী দুই-এক দিনের মধ্যেই সবাই বরাদ্দ পেয়ে যাবেন বলে মন্ত্রী ও স্পিকার আশ্বস্ত করেন।
একই ধরণের বৈষম্যের প্রশ্নে এনসিপির অপর সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের প্রশ্নের জবাবে ত্রাণমন্ত্রী জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশের সব সংসদীয় আসনে নির্বাচনী এলাকা প্রতি কাবিটা ২৫ লাখ টাকা, টিআর ৩০ লাখ টাকা এবং কাবিখা কর্মসূচির আওতায় ৪০ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য ইতোমধ্যে বরাদ্দ দিয়েছে। এর বাইরে স্থানীয় সংসদ সদস্যদের ডিও লেটার ও বিশেষ চাহিদার আলোকে অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে।
কক্সবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল তার এলাকার প্রাকৃতিক ঝুঁকির কথা বিবেচনা করে বিশেষ বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি জানালে মন্ত্রী জানান, দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হচ্ছে এবং বিশেষ আবেদন থাকলে তা ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী তার নির্বাচনী এলাকা টাঙ্গাইল-৭ আসনে সাম্প্রতিক ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ির জন্য জরুরি ঢেউটিনের সহায়তা কামনা করেন। জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নতুন করে ঢেউটিন কেনার কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। তবে বর্তমান সরকার নতুন করে টিন সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং শিগগিরই তা ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে বিতরণসহ গৃহ মঞ্জুরি বরাদ্দ দেওয়া হবে।
সিলেট-৬ আসনের সদস্য ইমরান আহমেদ চৌধুরী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে নির্মিত গ্রামীণ সেতু ও কালভার্টের নিম্নমান নিয়ে প্রশ্ন তুললে মন্ত্রী তা সরাসরি নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট কোনো কাজের গুণগত মান খারাপ হয়ে থাকলে তা মন্ত্রণালয়ের নোটিশে আনলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলেও তিনি জানান।
সংরক্ষিত আসনের জামায়াত দলীয় নারী সংসদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দীকার এক প্রশ্নের জবাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী জানান, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী ইতোমধ্যে ৫৮৮টি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, ৩২৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র এবং ১১৫টি দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এর বাইরে আরও বড় পরিসরে নতুন বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংসদকে অবহিত করেন, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সারা দেশে দুই ঈদ উপলক্ষ্যে ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় মোট ২ কোটি ২ লাখ ১ হাজার ৫৩৬ জন উপকারভোগীর মাঝে ১০ কেজি হারে মোট দুই লাখ দুই হাজার ১৫ দশমিক ৩৬ টন চাল সফলভাবে বিতরণ করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এই সহায়তার পরিমাণ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
সময়ের আলো/টিএইচ