এআইয়ে স্বস্তি, ব্যাটারি রিকশায় অস্বস্তি

অলিউল ইসলাম

জাতীয়

রাজধানীর সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক নজরদারি চালুর পর সিগন্যাল মানা, হেলমেট ব্যবহার ও লেন শৃঙ্খলায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা

2026-06-09T06:06:47+00:00
2026-06-09T06:14:16+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬,
২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
জাতীয়
রাজধানীর সড়ক
এআইয়ে স্বস্তি, ব্যাটারি রিকশায় অস্বস্তি
অলিউল ইসলাম
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬, ৬:০৬ এএম  আপডেট: ০৯.০৬.২০২৬ ৬:১৪ এএম  (ভিজিট : ১৮)
নিয়ম মানছে না ঢাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর সড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর ট্রাফিক নজরদারি চালুর পর সিগন্যাল মানা, হেলমেট ব্যবহার ও লেন শৃঙ্খলায় ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। তবে নম্বরপ্লেট ও নিবন্ধনহীন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল সেই অগ্রগতিকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।

এআই ক্যামেরা আইনভঙ্গকারী নিবন্ধিত যানবাহনের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা নিতে পারলেও অনিবন্ধিত অটোরিকশার ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় স্বস্তি ফিরতে শুরু করলেও সড়কের বিশৃঙ্খলা পুরোপুরি কাটছে না বলে মনে করছেন ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অবৈধ ও অননুমোদিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে না আনলে এআইভিত্তিক এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পাওয়া যাবে না।

ঢাকার প্রধান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী শনাক্ত করতে এআইচালিত ক্যামেরার মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মামলা ব্যবস্থার কার্যক্রম শুরু করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। লাল বাতি অমান্য করা, স্টপ লাইন অতিক্রম করা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং উল্টো পথে যানবাহন চালানোর মতো অপরাধ শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। 

এর প্রভাবে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চালকদের মধ্যে নিয়ম মানার প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে গত ৭ মে পরীক্ষামূলকভাবে এআই ক্যামেরা স্থাপনের পর ১ জুন পর্যন্ত ৬৮৯টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩১২টি মামলা হয়েছে বাসের বিরুদ্ধে। একই সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৫০টি। বাকি ২২৭টি মামলা হয়েছে মোটরসাইকেল, পিকআপ, লেগুনা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে। নিয়ম ভাঙার সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেল মোড়ে।

তবে এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার মতো অনিবন্ধিত বাহন। অধিকাংশ অটোরিকশার বৈধ নিবন্ধন ও নম্বরপ্লেট না থাকায় আইন ভঙ্গ করলেও তাদের বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রযুক্তিনির্ভর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবতার মুখে এসে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

শনিবার রাজধানীর শাহবাগ, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেট এলাকায় সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলো স্টপ লাইন অতিক্রম করছে, জেব্রা ক্রসিং দখল করছে এবং সুযোগ পেলেই উল্টো লেনে প্রবেশ করছে। অনেক ক্ষেত্রে সিগন্যাল অমান্য করে তারা সামনে চলে যাচ্ছে। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে। অন্যদিকে মোটরসাইকেল চালকদের একটি বড় অংশকে হেলমেট পরে এবং সিগন্যাল মেনে চলতে দেখা গেছে।

ফার্মগেটে এয়ারপোর্টগামী যাত্রী আল আমিন সময়ের আলোকে বলেন, আগে অনেক সময় দেখা যেত সিগন্যাল লাল থাকলেও মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকেরা নিয়ম ভেঙে সামনে চলে যেতেন। এখন সেই প্রবণতা কিছুটা কমেছে। মানুষ বুঝতে পারছে যে ক্যামেরায় ধরা পড়লে জরিমানা এড়ানোর সুযোগ নেই। 

কিন্তু ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোর ক্ষেত্রে যেন কোনো নিয়মই কার্যকর হচ্ছে না। তারা যখন-তখন রাস্তার মাঝখানে থেমে যাচ্ছে, উল্টো পথে ঢুকছে এবং অন্য যানবাহনের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে প্রযুক্তি চালু হলেও সড়কে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফিরে আসছে না।

কারওয়ান বাজারের সিগন্যালে দেখা যায়, সিগন্যাল লাল থাকা সত্ত্বেও অটোরিকশাগুলো সুযোগ পেলেই আইন অমান্য করে সামনে চলে যাচ্ছে। কেউ ট্রাফিক আইনকে তোয়াক্কা না করে উল্টো পথে ঢুকছে, আবার কেউ রাস্তার মাঝেই হঠাৎ যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। যার ফলে মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে তীব্র যানজট।

একই দৃশ্য দেখা গেছে বাংলামোটর মোড়েও। সেখানে সিগন্যাল ছাড়ার পরপরই বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ির সামনে আচমকা অটোরিকশা চলে আসায় অন্যান্য যানবাহনের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে।

সড়কের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ যাত্রী ও গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের অভিযোগও একই রকম। কারওয়ান বাজারে গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষমাণ যাত্রী সুমাইয়া আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে সময়ের আলোকে বলেন, প্রতিদিন অফিসে যাতায়াত করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় অটোরিকশার কারণে। সিগন্যালের কোনো তোয়াক্কা না করে তারা সামনে চলে আসে এবং পুরো লেনের গতি কমিয়ে দেয়। 

অনেক সময় যাত্রী উঠানো-নামানোর জন্য রাস্তার মাঝেই দাঁড়িয়ে যায়। এতে পেছনে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়। অন্য যানবাহনের চালকেরা নিয়ম মেনে চললেও কয়েকটি অটোরিকশার কারণে পুরো মোড়ের শৃঙ্খলা নষ্ট হয়ে যায়। প্রশাসন যদি এদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, তা হলে সড়কে পরিস্থিতি আরও উন্নত হবে বলে মনে করছেন তিনি।

ট্রাফিক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এআইভিত্তিক নজরদারি চালুর পর সিগন্যাল অমান্য, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো এবং উল্টো পথে চলার মতো অপরাধ কিছুটা কমেছে। তবে অনিবন্ধিত অটোরিকশা একই ধরনের আইনভঙ্গ অব্যাহত রাখায় মোড়ভিত্তিক যান চলাচলে কাক্সিক্ষত উন্নতি আসছে না। ফলে প্রযুক্তির সুফল ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে একটি স্পষ্ট বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।

তবে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে অটোরিকশাকে আর কোনো ছাড় দিতে রাজি নয় প্রশাসন। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজধানীর রাস্তায় যে শৃঙ্খলার শুরু হয়েছে, তা কোনোভাবেই অটোরিকশার কারণে নষ্ট হতে দেওয়া হবে না বলে জানান ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা।

প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা নিয়ে কারওয়ান বাজার এলাকার সার্জেন্ট অমিত চৌধুরী সময়ের আলোকে বলেন, আগে আমরা নিজেরা ম্যানুয়ালি সিগন্যাল কন্ট্রোল করতাম। অটো হওয়ার কারণে সিগন্যাল কন্ট্রোলে আগের থেকে অনেক সুবিধা হয়েছে। যার কারণে সিগন্যাল মানার ক্ষেত্রে মানুষ এখন অনেক বেশি সচেতন। এই কারণে বিষয়টি অবশ্যই আমাদের জন্য স্বস্তিদায়ক।

অটোরিকশার ঝামেলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অটোরিকশা অবশ্যই ঝামেলা করছে এবং আমরা প্রতিদিন নিয়মিত ডাম্পিং করছি। আজকের (গতকাল) দিনেও কারওয়ান বাজারের সিগন্যাল থেকে ১০টি রিকশা আমরা ডাম্পিং করেছি। প্রতিদিন ১০ থেকে ২০টি করে ডাম্পিং হয়। সব জায়গায় ডাম্পিং করছি। কিন্তু অটোরিকশা এত বেশি পরিমাণ বেড়ে গেছে যে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে সামনে কিছু করার চিন্তা-ভাবনা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, করপোরেশন ব্যবস্থা নিচ্ছে। উত্তরা থেকে সাভার পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে তিনি জানান।

মাঠপর্যায়ে ট্রাফিক পুলিশের অভিজ্ঞতা এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগের সঙ্গে অনেকটাই মিল পাচ্ছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরাও। তাদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেলেও ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থার মৌলিক সমস্যাগুলো এখনও রয়ে গেছে। বিশেষ করে অনিবন্ধিত ও অননুমোদিত যানবাহনের আধিপত্য এআইভিত্তিক ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতাকে সীমিত করে দিচ্ছে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান সময়ের আলোকে বলেন, এআই আমাদের শেষ দাওয়াই। সড়কের শৃঙ্খলা আনার ক্ষেত্রে আমরা যদি এআই ইমপ্লিমেন্টেশনের পরেও হোঁচট খেয়ে যাই, তা হলে কার্যকর বিকল্প খুব বেশি থাকবে না।

তিনি বলেন, বিশ্বের যেসব দেশ এআইভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে, তারা আগে পরিবহন খাতকে নিবন্ধন ও জবাবদিহির আওতায় এনেছে। বাংলাদেশেও অনিবন্ধিত ও নম্বরপ্লেটবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।

তিনি আরও বলেন, অনিবন্ধিত যানবাহন, লাইসেন্স প্লেটবিহীন যানবাহন কিংবা ফিটনেসবিহীন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এআই ব্যবস্থার শতভাগ সফলতা পাওয়া সম্ভব হবে না। বর্তমানে কিছু ইতিবাচক ফল দেখা গেলেও বড় ধরনের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। অন্তত যেসব করিডোরে ডিজিটাল সিগন্যাল ও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে, সেসব এলাকায় অননুমোদিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল হক সময়ের আলোকে বলেন, ভিআইপি সড়কে কিছু ইতিবাচক ফল দেখা গেলেও সেটিকে পুরো ঢাকার উন্নতি বলা যাবে না। কারণ রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় এখনও বিপুলসংখ্যক অবৈধ ও নিবন্ধনবিহীন যানবাহন, অদক্ষ চালক এবং দুর্বল আইন প্রয়োগের সমস্যা রয়েছে।

তিনি বলেন, এআই কার্যকরভাবে কাজ করতে হলে সঠিক ডেটাবেজ, সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এসব পূর্বশর্ত পূরণ না হলে প্রযুক্তিটি বাস্তবে কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। তার মতে, মানুষের নজরদারি ও আইন প্রয়োগ যেখানে কার্যকর নয়, সেখানে শুধু প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হবে না। 

এআইকে কোনো জাদুকরি সমাধান নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল ও তথ্যভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থার সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে দেখতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর সড়কে প্রযুক্তিনির্ভর শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার যে উদ্যোগ শুরু হয়েছে, তা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে। এআইভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থা আইন মানার সংস্কৃতি তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও অনিবন্ধিত ও অননুমোদিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর পূর্ণ সুফল পাওয়া কঠিন হবে। 

ফলে ঢাকার সড়কে স্থায়ী শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রযুক্তির পাশাপাশি কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

সময়ের আলো/জেডি 



  বিষয়:   এআই  স্বস্তি  ব্যাটারি রিকশা  অস্বস্তি 


Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: