বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ সংগ্রহ ও বিপণন কার্যক্রমে গুরুতর আর্থিক ক্ষতি এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ বীজ অবিক্রিত থেকে যাওয়ায় সংস্থাটিকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে এসে ভারত থেকে এন-৫৩ জাতের ১০৯ মেট্রিকটন পেঁয়াজ বীজ সংগ্রহ কেন্দ্র করে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে ফ্যাসিবাদী আমলের সেই বহুল আলোচিত অমিত-বঙ্গ সিন্ডিকেট।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিএডিসি চলতি অর্থবছরে ১৫ হাজার মেট্রিকটন গম বীজ, ৫৫ হাজার মেট্রিকটন বোরো বীজ এবং ৩৮ হাজার টন আলু বীজ কিনেছিল। চলতি অর্থবছরে সংস্থাটির গুদামে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টন গম বীজ এবং ২০ থেকে ২২ হাজার টন বোরো বীজ অবিক্রিত অবস্থায় ছিল।
পাশাপাশি প্রায় ২৫ হাজার টন আলু বীজও বিক্রি না হওয়ায় বাজারে নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করতে হয়েছে। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএডিসি প্রতি কেজি আলু বীজ ২৮ থেকে ২৯ টাকায় সংগ্রহ করলেও পরে তা মাত্র ৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছে।
ধান বীজের ক্ষেত্রে প্রতি কেজি ৫০ টাকা ক্রয়মূল্যের সঙ্গে ১০ টাকা প্রসেসিং ব্যয় যুক্ত হয়ে মোট খরচ দাঁড়ায় ৬০ টাকা। অথচ সেই বীজ বিক্রি করা হয়েছে মাত্র ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। একইভাবে গম বীজ ৫৫ টাকা ক্রয়মূল্য এবং ১০ টাকা পরিবহন ব্যয়সহ মোট ৬৫ টাকা খরচে সংগ্রহ করা হলেও বিক্রি হয়েছে ৩৫ টাকা কেজি দরে।
ফলে আলু বীজে ক্ষতি প্রায় ৬১ কোটি টাকা, ধান বীজে ক্ষতি প্রায় ৬৫ কোটি টাকা এবং গম বীজে ক্ষতি প্রায় ২৪ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এই তিন ধরনের বীজে বিএডিসির এক বছরেই মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত অর্থবছরেও ঠিক একইভাবে অবিক্রিত বীজে সরকারের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। অভিযোগে রয়েছে প্রয়োজনের চেয়ে অতিক্তি বীজ ক্রয় করে পরে একটি সিন্ডিকেটের কাছে অবিক্রিত বীজ নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করা হয়।
এদিকে এই বড় অঙ্কের লোকসানের মধ্যেই কৃষকদের প্রণোদনার জন্য ১০৯ মেট্রিকটন পেঁয়াজ বীজ সংগ্রহের ক্ষেত্রে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভারত থেকে এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজ বীজ প্রতি কেজি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা কেজি দরে সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে সরবরাহ করার জন্য একটি সিন্ডিকেট তৎপরতা শুরু করেছে। অভিযোগ উঠেছে বিএডিসির মসলা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে সমন্বয় করে অমিত-বঙ্গ সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়া প্রভাবিত করছে। চলতি মৌসুমে ১০৯ মেট্রিকটন এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজ বীজ সংগ্রহের জন্য আহ্বান করা দরপত্রের শর্ত এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যে, সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ কার্যত কঠিন হয়ে পড়েছে।
৫টি লটে দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ১৭ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সরকারি বীজ সরবরাহের ৮০ শতাংশেরও বেশি কাজ এই সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল। কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার অভিযোগ থাকলেও তাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বরং সময়ের সঙ্গে তাদের প্রভাব আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
কৃষি খাতের একাধিক সূত্র জানায়, অতীতে সিন্ডিকেটের সরবরাহ করা নিম্নমানের বীজের কারণে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। গত বছরও এই সিন্ডিকেটের সরবরাহ করা নিম্নমানের বীজের কারণে পেঁয়াজচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দৈনিক সময়ের আলোসহ দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে সরকারি বীজের প্রতি কৃষকদের আস্থাও কমেছে।
এ ছাড়া সিন্ডিকেট সদস্য নাজমুল গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন সরকারি পর্যায়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাকে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে কাজ নেওয়া হতো।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিএডিসির উপপরিচালক ও মানসম্পন্ন মসলা বীজ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকণ ও বিতরণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আকিকুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, বিএডিসি বীজ সংগ্রহ, বিতরণ বা বিক্রি সবকিছুই নিয়ম মেনে করে থাকে। নিয়মের বাইরে কিছু করা হয় না। পেঁয়াজ বীজ ক্রয়ের ক্ষেত্রে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। কোনো সিন্ডিকেট আছে এমন অভিযোগ পাওয়া যায়নি। কেউ যদি অভিযোগ করে সিন্ডিকেটের কারণে দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারছে না তা হলে সে যাতে অংশ নিতে পারে সে ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। তাদের মূল ইস্যু হচ্ছে মানসম্পন্ন বীজ সংগ্রহ করা। এ ক্ষেত্রে কোনো আপস করা হবে না।
সময়ের আলো/জেডি