চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের প্রায় ৩১শ একর খাসজমির মধ্যে বিপুল পরিমাণ জমি রেকর্ডপত্র থেকে গায়েব হয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ভূমি অফিস ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি জমি বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে।
দখলদারদের তালিকায় সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ও তার পরিবারের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী জঙ্গল সলিমপুরে প্রায় ৩ লাখ ১০ হাজার শতক (৩১শ একর) সরকারি খাসজমি রয়েছে। তবে সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের সংরক্ষিত রেকর্ডে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮১ শতক জমির তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৯১ শতক জমির কোনো রেকর্ড পাওয়া যাচ্ছে না।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের সঙ্গে ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি করা হয়েছে। পরে সেগুলোর নামজারিও সম্পন্ন করা হয়। এক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইয়াসিনকে মালিক সাজিয়ে জঙ্গল সলিমপুরের বহু জমি বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে। তদন্ত হলে পুরো চিত্র সামনে আসবে বলে তিনি দাবি করেন।
জানা যায়, সরকারি খাসজমি দখলের জন্য প্রথমে পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলা হয়। এরপর পাহাড় কেটে মাটি ও বালু বিক্রি করে সেখানে আবাসিক প্লট তৈরি করা হয়। এতে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার প্রায় ৭০ শতাংশ পাহাড় ও টিলা ধ্বংস হয়ে গেছে। এক সময় পাহাড় ও টিলায় ঘেরা বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অনেকাংশে খালে পরিণত হয়েছে।
এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ওপর দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে রাস্তা নির্মাণ করে সেখানে ভারী যানবাহন চলাচল করানো হচ্ছে। এতে যে কোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণের আশঙ্কা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমদ এ বিষয়ে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের জমির প্রকৃত চিত্র জানতে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন চাওয়া হবে।
প্রভাবশালীরা কীভাবে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন এবং জমির বর্তমান অবস্থা কী, তা খতিয়ে দেখা হবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বাবা আখতারুজ্জমান বাবুর প্রতিষ্ঠিত ‘চৌধুরী অ্যাগ্রো’সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান সরকারি জমি দখল করে রেখেছে। এছাড়া চট্টগ্রাম ব্রিকস অ্যান্ড ক্লে ওয়ার্কস লিমিটেড, পোর্টলিংক লজিস্টিকস কনটেইনার লিমিটেড, খান অ্যাগ্রো, সলিমপুর সিডিএ আবাসিক এলাকা, মুক্তিযোদ্ধা বসতি নগর, জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড এবং সীমা অটোমেটিক স্টিল রি-রোলিং মিলসের নামও দখলদারদের তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
খাসজমি উদ্ধারে ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক মাস্টারপ্ল্যান সভায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। সভায় জানানো হয়, ২০১৭ সালে খাসজমি দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হলেও রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের কারণে তা সফল হয়নি।
এদিকে খাসজমি দখলমুক্ত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়ার পর অন্তত অর্ধশত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসনের কাছে জমি বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, বিজিএমইএসহ বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ের রেকর্ডে বর্তমানে মাত্র ৯১০ একর জমির তথ্য রয়েছে। এত বিপুল সংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যে কীভাবে জমি বরাদ্দ দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে ভূমি মন্ত্রণালয়।
জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাসজমি বেহাত হওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে সরকারি সম্পদ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
সময়ের আলো/জোই