ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে ১৬ বছরের হৃদয় শেখের। চারপাশে যখন সমবয়সীরা বই-খাতা গুছিয়ে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, ঠিক তখনই জীবিকার তাগিদে ব্যাটারিচালিত অটোভ্যানের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে রাস্তায় নামতে হয় তাকে।
যে বয়সে একজন কিশোরের সবচেয়ে বড় চিন্তা হওয়ার কথা পরীক্ষার ফল, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা কিংবা ভবিষ্যতের স্বপ্ন, সেই বয়সেই হৃদয়ের কাঁধে এসে পড়েছে পাঁচ সদস্যের পুরো পরিবারের দায়িত্ব। নির্মম বাস্তবতা তাকে শৈশব থেকে ছিনিয়ে এনে দাঁড় করিয়েছে সংগ্রামের ময়দানে।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ভদ্রঘাট ইউনিয়নের চৌদুয়ার গ্রামের সুজাব আলী শেখ ও আমেনা খাতুন দম্পতির বড় ছেলে হৃদয় শেখ। একসময় কৃষিকাজ ও অটোভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন বাবা সুজাব আলী। কিন্তু প্রায় ছয় বছর ধরে ফুসফুসসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি এখন প্রায় শয্যাশায়ী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে ছোট্ট হৃদয়ের কাঁধে।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, যে ছেলেটি সংসার চালাচ্ছে, সেও নিজেই গুরুতর অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিল রোগে ভুগছে হৃদয়। অর্থের অভাবে চিকিৎসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শরীর অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেছে। বর্তমানে তার ওজন প্রায় ১০৪ কেজি। হাঁটতে কষ্ট হয়, পায়ে ঠিকমতো ভর দিতে পারে না। তবুও বিশ্রামের সুযোগ নেই। কারণ, সে থেমে গেলে থেমে যাবে অসুস্থ বাবার ওষুধ, ছোট ভাই-বোনের খাবার আর পুরো পরিবারের জীবন চাকা।
জানা যায়, ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভাড়ার অটোভ্যান চালিয়েও খুব বেশি আয় হয় না। যাত্রী না থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তার মোড়ে অপেক্ষা করতে হয়। দিনের শেষে যে সামান্য টাকা হাতে আসে, তার বড় অংশ চলে যায় ভ্যানের ভাড়া, বাবার প্রতিদিনের ১৫০ থেকে ২০০ টাকার ওষুধ এবং সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচে। নিজের চিকিৎসার জন্য আলাদা করে একটি টাকাও জমাতে পারেন না হৃদয়।
ভাঙা কণ্ঠে হৃদয় শেখ বলেন, আমার কিডনির সমস্যার কারণে শরীর অনেক ফুলে গেছে। এখন ওজন প্রায় ১০৪ কেজি। পায়ে ঠিকমতো ভর দিতে পারি না। অনেক কষ্ট হয়। বাবার প্রতিদিন ১৫০ থেকে ২০০ টাকার ওষুধ লাগে। আমি যদি ভ্যান নিয়ে না বের হই, তাহলে সংসার চলবে না, বাবার ওষুধও কেনা হবে না। সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে, আমাকে রেখে যদি বাবা মারা যান। চিকিৎসা করানোর মতো কোনো সামর্থ্য নেই। সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে সহযোগিতা চাই।
চোখে অশ্রু আর বুকভরা অসহায়ত্ব নিয়ে মা আমেনা খাতুন বলেন, স্বামী অনেক বছর ধরে অসুস্থ। বড় ছেলে ছোটবেলা থেকেই কিডনির রোগে ভুগছে। বগুড়ায় চিকিৎসা করিয়েছিলাম, কিন্তু টাকার অভাবে আর চালিয়ে যেতে পারিনি। ছেলে সারাদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় করে, ভ্যানের ভাড়া দেওয়ার পর সংসারই ঠিকমতো চলে না। অনেক সময় অন্যের বাড়ি থেকে শাক-সবজি এনে রান্না করে দিন পার করি। দুইজনের ওষুধ কিনতে গিয়ে অনেক দিন একবেলা খেয়ে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হয়।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে সুজাব আলী বলেন, আমি আগে মানুষের জমিতে কাজ করতাম, পরে ভ্যানও চালিয়েছি। এখন অসুস্থ হয়ে কোনো কাজ করতে পারি না। আমার ছেলেটাও কিডনির রোগী। অথচ সেই ছেলেই আজ পুরো সংসার চালাচ্ছে। একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় কষ্ট আর কী হতে পারে? টাকার অভাবে ওর চিকিৎসাও হচ্ছে না, নিজের চিকিৎসাও করাতে পারছি না।
মাত্র দেড় শতাংশ জমির ওপর একটি ছোট্ট টিনের ঘরেই বসবাস পরিবারটির। সামান্য কিছু আসবাবপত্র আর অনিশ্চয়তায় ভরা জীবনই তাদের একমাত্র সম্বল। ছোট বোনের পড়াশোনা এবং ছোট ভাইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়েও দিনরাত উদ্বেগে থাকেন পরিবারের সদস্যরা।
প্রতিবেশী জুরান আলী বলেন, হৃদয়ের পরিবারের কষ্ট আমরা অনেক বছর ধরে দেখে আসছি। ছেলেটা নিজেও অসুস্থ, তারপরও পরিবারের জন্য দিন-রাত ভ্যান চালায়। ওদের অবস্থা সত্যিই খুব মানবেতর। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান মানুষ যদি এগিয়ে আসেন, তাহলে পরিবারটি নতুন করে বাঁচার আশা পাবে।
আরেক প্রতিবেশী শাপলা বেগম বলেন, ওদের অসহায় অবস্থা দেখে যখন যা পারি সাহায্য করি। কিন্তু আমাদের সামর্থ্যও সীমিত। সরকার যদি একটু সুদৃষ্টি দেয় এবং সমাজের বিত্তবানরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
কামারখন্দ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোতালিব বলেন, কিডনি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার ছেলে কিছু দিন আগে আমাদের কার্যালয়ে এসেছিলেন। তবে সে সময় তারা রোগীর ডায়ালাইসিস সংক্রান্ত কোনো চিকিৎসা প্রতিবেদন (রিপোর্ট) উপস্থাপন করতে পারেননি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তখন সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক সহায়তা প্রদান সম্ভব হয়নি। তবে তারা যদি ডায়ালাইসিসের বৈধ চিকিৎসা প্রতিবেদন জমা দিতে পারেন, তাহলে সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী তাদের জন্য ১ লাখ টাকা অনুদানের ব্যবস্থা করা হবে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আত্মসম্মানের কারণে হৃদয়ের পরিবার কখনো কারও কাছে হাত পাততে চায়নি। কিন্তু বাস্তবতা এখন এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সরকারি সহায়তা ও মানবিক মানুষের সহযোগিতা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
কৈশোরের সব স্বপ্ন অনেক আগেই হারিয়ে গেছে হৃদয়ের জীবন থেকে। স্কুলের ঘণ্টা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা কিংবা ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্ন সবকিছুই চাপা পড়ে গেছে সংসারের দায়-দায়িত্বের নিচে। প্রতিটি সকাল শুরু হয় পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে, আর প্রতিটি রাত শেষ হয় বাবার ওষুধ আর পরদিনের সংসারের হিসাব কষতে কষতে।
তবুও হৃদয় এখনো স্বপ্ন দেখতে জানে। তার স্বপ্ন খুব বড় নয়, বাবাকে সুস্থ দেখতে চায়, নিজের চিকিৎসা করাতে চায়, ছোট বোনের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, আর ছোট ভাইকে যেন তার মতো অল্প বয়সে সংসারের হাল ধরতে না হয়। হৃদয়ের গল্প শুধু একটি পরিবারের সংগ্রামের গল্প নয়, এটি আমাদের সমাজের সেই নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে দারিদ্র্য শুধু মানুষের স্বপ্নই কেড়ে নেয় না, কেড়ে নেয় একটি শিশুর শৈশবও। অসুস্থ শরীর নিয়েই যখন একটি কিশোর হয়ে ওঠে পুরো পরিবারের শেষ আশ্রয়, তখন প্রশ্ন থেকে যায়, মানবিকতার এই সমাজে তার পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কি শুধু তার একার?
সময়ের আলো/আতা