থেমে যাচ্ছে মৃৎশিল্পের চাকার ঘূর্ণন

মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী

সারাদেশ

একসময় রান্নাঘর থেকে শুরু করে ঘরের নানান কাজে মাটির তৈরি পণ্য ব্যবহার করা হতো। পানি রাখার জন্য কলস, রান্নার জন্য

2026-09-27T23:29:41+00:00
2026-09-27T23:29:41+00:00
 
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সারাদেশ
থেমে যাচ্ছে মৃৎশিল্পের চাকার ঘূর্ণন
মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিন, বাঁশখালী
প্রকাশ: রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১১:২৯ পিএম 
বাঁশখালীর রুদ্রপাড়ায় মৃৎশিল্পী দিলীপ রুদ্র মাটি দ্বারা তৈজসপত্র বানাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। ছবি : সময়ের আলো
একসময় রান্নাঘর থেকে শুরু করে ঘরের নানান কাজে মাটির তৈরি পণ্য ব্যবহার করা হতো। পানি রাখার জন্য কলস, রান্নার জন্য হাঁড়ি, খাবার পরিবেশনের জন্য থালা— সবকিছুতেই ছিল মাটির ব্যবহার। মাটির তৈরি এসব পণ্য শুধু ঐতিহ্যের অংশ নয়, পরিবেশের জন্যও তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। ‎অথচ একসময় যেখানে মাটির তৈরি সামগ্রী আর কারিগরদের ব্যস্ততায় উৎসব মুখর থাকত, সেখানে এখন অনেকটাই সুনসান নীরবতা।

‎এ দৃশ্য বাঁশখালী উপজেলার কালীপুর ইউনিয়নের রুদ্রপাড়ার। একসময় এই পাড়ার পরিচিতি ছিল মাটির তৈরি নানা পণ্যের জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যা চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে চলত কারিগরদের জীবন। কুমারের নরম হাতে কাদামাটির দলা নিয়ে নিপুণ কারুকাজে তৈরি হতো কলস, বাসন-কোসন, সরা, সুরাই, হাঁড়ি-পাতিল, পেয়ালা, মটকা, ব্যাংক, থালা, বাটি, ফুলের টব, কলসি, থালা, কুলা, টব, পিঠা তৈরির ছাঁচসহ নানা ধরনের ব্যবহারিক ও শৌখিন সামগ্রী। এসব পণ্য শুধু রুদ্রপাড়াতেই নয়, উপজেলার পুকুরিয়া, সাধনপুর, কালীপুর, বৈলছড়ি, জলদী, শীলকূপ, চাম্বল ও পুঁইছড়ি ইউনিয়নেও বেশ জনপ্রিয় ছিল।

কালের বিবর্তনে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। বাজার দখল করেছে প্লাস্টিক, অ্যালুমিনিয়াম ও নানা ধরনের কৃত্রিম পণ্যে। সহজলভ্যতা, কম দাম ও টেকসই হওয়ার কারণে মানুষ ঝুঁকছে এসব পণ্যের দিকে। আর সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে কমেছে মাটির তৈরি পণ্যের চাহিদা।

‎ফলে রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্পীদের চাকার ঘূর্ণনও যেন ধীরে ধীরে থেমে যাচ্ছে। রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্পীদের কাছে মাটি শুধু কাঁচামাল নয়, এ মাটিই তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন। বংশপরম্পরায় শেখা এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের পারিবারিক ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জীবিকা।

‎একসময় একটি পরিবারের একাধিক সদস্য মৃৎশিল্পের কাজে যুক্ত থাকতেন। কেউ মাটি সংগ্রহ করতেন, কেউ মাটি প্রস্তুত করতেন, কেউ চাকা ঘুরিয়ে পাত্র তৈরি করতেন। তৈরি হওয়া পণ্য শুকানোর পর তা পোড়ানো হতো। এরপর ভ্যান, মাথায় করে কিংবা উপজেলার বিভিন্ন বাজারে নিয়ে বিক্রি করা হতো। দিন শেষে সেই বিক্রির টাকাতেই চলত সংসার।

‎কিন্তু এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। মাটি সংগ্রহ থেকে শুরু করে পণ্য তৈরি ও পোড়ানো পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে একজনই কাজ করছেন। সব কিছুর দাম বাড়লে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ নেই। ক্রেতারা বেশি দাম দিতে চান না। ফলে অনেক সময় দিনভর শ্রম দিয়েও কাঙ্ক্ষিত আয় হচ্ছে না।


রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্পী স্নিগ্ধ দাশ বলেন, ‘আমি বিশ-ত্রিশ বছর আগে থেকে এই কাজ করছি। বছরে ৬ মাস মৌসুম থাকে। ‎আগে মাটির পণ্যের চাহিদা ছিল। বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসে আমাদের কাছ থেকে পণ্য কিনে নিয়ে যেত। এখন প্লাস্টিক ও অন্য সামগ্রী সহজলভ্য হওয়ায় মাটির পণ্য বিক্রি অনেক কমে গেছে। দিনভর পরিশ্রম করে যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।’

‎মৃৎশিল্পীদের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা শুধু বর্তমান আয় নিয়ে নয়। এই পেশার ভবিষ্যৎ নিয়েও। পরিবারের নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর মাটির কাজ শিখতে আগ্রহী নন। দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করেও যখন নিশ্চিত আয় নেই, তখন তরুণরা অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে প্রজন্মের হাত থেকে প্রজন্মে যে দক্ষতা চলে আসছিল, সেটিও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

মৃৎশিল্পী সুজিত রুদ্র বলেন, ‘আমি আমার বাপ-দাদার পেশা হিসেবে এটাকে আঁকড়ে ধরেছি। কিন্তু আমার সন্তানরা এই পেশায় আসতে আগ্রহী না। এখানে পাড়ার প্রত্যেকের ঘরে ঘরে মাটির তৈরি জিনিসপত্র তৈরি হতো। এখন আমরা কয়েক পরিবার কাজ করছি। বাজারে চাহিদা কম। কম দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে। কখনো কখনো উৎপাদন খরচের সঙ্গে বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য না থাকায় লোকসানও গুনতে হচ্ছে। মৃৎশিল্প হারিয়ে যাওয়া মানে শুধু কয়েকটি পরিবারের একটি পেশা হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যাবে গ্রামীণ বাংলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য।

চাকার ওপর ঘুরতে থাকা এক টুকরো মাটি যখন ধীরে ধীরে কলস কিংবা হাঁড়ির আকৃতি নেয়, তখন সেখানে শুধু একজন কারিগরের হাতের দক্ষতা থাকে না; থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে আসা অভিজ্ঞতা আর শিল্পীর নিখুঁত হাতে গড়া শিল্পকর্ম। 
সচেতন মহলের মতে, মৃৎশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মৃৎশিল্পীদের সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক প্রশিক্ষণ, কাঁচামাল সংগ্রহে সহায়তা এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণের ব্যবস্থা করা দরকার।

কণ্ঠশিল্পী ও সামাজিক সংগঠক শাহাবুদ্দিন শিহাব জানান, ‘পরিবেশবান্ধব মাটির পণ্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়াতে সচেতনতা তৈরিও জরুরি। প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে মাটির তৈরি পণ্যকে জনপ্রিয় করা গেলে একদিকে যেমন পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখা সম্ভব, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পও টিকে থাকতে পারে।’

রুদ্রপাড়ার মৃৎশিল্পীদের প্রত্যাশা একটাই— তাদের এই পেশা যেন কেবল ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাতায় আটকে না থাকে। তারা চান, আবারও ঘুরুক মৃৎশিল্পের চাকা। উঠোনজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক মাটির গন্ধ।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   বাঁশখালী  রুদ্রপাড়া  মৃৎশিল্পী  মাটি  তৈজসপত্র  সময়ের আলো  চট্টগ্রাম 


Advertisement
Loading...
Loading...
সারাদেশ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: