বিশ্বকাপের মঞ্চে নারী রেফারি

নিবেদিতা দাস

খেলা

একসময় ফুটবল মাঠে নারী রেফারিকে দেখা ছিল বিরল ঘটনা। খেলোয়াড়, কোচ কিংবা দর্শক, সবার কাছেই রেফারি মানেই ছিল পুরুষ। কিন্তু

2026-06-10T03:34:02+00:00
2026-06-10T03:34:02+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
খেলা
বিশ্বকাপের মঞ্চে নারী রেফারি
নিবেদিতা দাস
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ৩:৩৪ এএম   (ভিজিট : ১০)
ছবি : সংগৃহীত
একসময় ফুটবল মাঠে নারী রেফারিকে দেখা ছিল বিরল ঘটনা। খেলোয়াড়, কোচ কিংবা দর্শক, সবার কাছেই রেফারি মানেই ছিল পুরুষ। কিন্তু সময় বদলেছে। এখন বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরেও নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ম্যাচ পরিচালনা করছেন। ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ পরিচালনার জন্য ৬ জন নারী রেফারিকে নির্বাচন করা হয়েছে।

ফিফার ঘোষিত চূড়ান্ত তালিকায় এবার স্থান পেয়েছেন ২ জন প্রধান রেফারি, ৩ জন সহকারী রেফারি এবং ১ জন ভিডিও ম্যাচ অফিসিয়াল (ভিএমও)। মেগা টুর্নামেন্টের এই আসরে রেফারি হিসেবে মাঠে থাকবেন যুক্তরাষ্ট্রের টোরি পেনসো এবং মেক্সিকোর কাতিয়া ইতজেল গার্সিয়া। সহকারী রেফারি হিসেবে সাইডলাইনে পতাকা হাতে দেখা যাবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাথরিন নেসবিট ও ব্রুক মায়ো এবং মেক্সিকোর সান্দ্রা রামিরেজকে। 

এ ছাড়া প্রযুক্তির সবচেয়ে আধুনিক শাখা, অর্থাৎ ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) কক্ষে ম্যাচ অফিসিয়াল হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নিকারাগুয়ার তাতিয়ানা গুজমান।

টোরি পেনসো
বর্তমান বিশ্বকাপের আলোচিত নারী রেফারিদের মধ্যে অন্যতম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টোরি পেনসো। তিনি ইতিমধ্যে ২০২৩ সালের অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ফিফা নারী বিশ্বকাপ ফাইনাল (স্পেন বনাম ইংল্যান্ড) সফলভাবে পরিচালনা করে আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছেন। 

পরে ফিফার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতাগুলোতেও দায়িত্ব পান। ফিফা তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা রেফারিদের একজন হিসেবে বিবেচনা করে।

কাতিয়া ইতজেল গার্সিয়া
মেক্সিকোর ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল রেফারি কাতিয়া। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার অভিজ্ঞতা ব্যাপক। শিক্ষাজীবনে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও লোকপ্রশাসন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী। ২০২৪ সালের মার্চ মাসে মেক্সিকোর পুরুষদের শীর্ষ ফুটবল লিগ ‘লিগা এমএক্স’-এ দীর্ঘ ২০ বছর পর প্রথম কোনো নারী প্রধান রেফারি হিসেবে ম্যাচ পরিচালনা করে ইতিহাস গড়েন। 

২০২৪ সালে তিনি মেক্সিকোর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার লাভ করেন এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল ইতিহাস ও পরিসংখ্যান ফেডারেশন কর্তৃক কনকাকাফ অঞ্চলের সেরা নারী রেফারি নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালে তিনি পুরুষদের কনকাকাফ গোল্ড কাপেও ম্যাচ পরিচালনা করেছেন। নারী ও পুরুষ উভয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এবারের বিশ্বকাপে তার অন্তর্ভুক্তি দেখিয়ে দেয় যে ফিফা এখন দক্ষতাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ক্যাথরিন নেসবিট
ক্যাথরিন নেসবিট কেবল একজন সফল রেফারিই নন, তিনি ফুটবলে আসার আগে রসায়নের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা করতেন। ২০১৯ বিশ্বকাপের ঠিক আগে তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে পূর্ণাঙ্গ রেফারিংয়ে যোগ দেন। 

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে পুরুষদের নকআউট পর্বের ম্যাচে প্রথম নারী অফিসিয়াল হিসেবে সাইডলাইনে দায়িত্ব পালন করে ইতিহাস গড়েন। ২০২০ সালে উত্তর আমেরিকার পুরুষদের পেশাদার খেলায় প্রথম নারী হিসেবে ‘এমএলএস অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি অব দ্য ইয়ার’ খেতাব পান। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ, ২০২৩ নারী বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ কোপা আমেরিকাতেও তিনি সফল সহকারী রেফারি ছিলেন।

ব্রুক মায়ো
ব্রুক মায়ো একজন সাবেক ফুটবল খেলোয়াড়, যিনি টেনেসী টেক ইউনিভার্সিটির হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন। খেলোয়াড় জীবনের ডিসিপ্লিন ও মাঠের বোঝাপড়াকে তিনি রেফারি ক্যারিয়ারে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন। ২০২৩ নারী বিশ্বকাপ ফাইনালের ম্যাচ অফিসিয়াল প্যানেলে টোরি পেনসোর সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

চমৎকার পারফরম্যান্সের কারণে ইউএস সরকার তাকে ২০২৫ সালের সেরা নারী রেফারি  হিসেবে নির্বাচিত করে। তিনি ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিক এবং ২০২৫ ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও সফলভাবে লাইন্সম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন।

সান্দ্রা রামিরেজ
২০১৯ সাল থেকে ফিফার আন্তর্জাতিক রেফারি তালিকায় থাকা সান্দ্রা মেক্সিকান ফুটবলের পরিচিত মুখ। মেক্সিকোর ঘরোয়া পুরুষ ও নারী লিগ ছাড়াও কনকাকাফ অঞ্চলের বড় বড় টুর্নামেন্টে নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেছেন। কাতিয়া ইতজেল গার্সিয়ার সঙ্গে মেক্সিকান ও আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রায়ই তাকে সহকারী হিসেবে জুটি বাঁধতে দেখা যায়।

তাতিয়ানা গুজমান
নিকারাগুয়ার সাবেক এই ফুটবলার এনভায়রনমেন্টাল কোয়ালিটি বিষয়ের গ্র্যাজুয়েট। তিনি তার দেশের পুরুষদের প্রথম বিভাগের লিগে ম্যাচ পরিচালনা করা প্রথম নারী রেফারি। তবে বর্তমানে তিনি প্রযুক্তিভিত্তিক রেফারিং বা ভিএআর চালনায় বিশ্বসেরাদের একজন। 

২০২৩ ফিফা নারী বিশ্বকাপে ভিডিও ম্যাচ অফিসিয়াল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে প্রথম নিকারাগুয়ান রেফারি হিসেবে বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার ইতিহাস গড়েন। ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি হিসেবে প্রযুক্তির নিখুঁত ব্যবহারের জন্য ফিফা তার ওপর বেশ আস্থাশীল। তিনি ২০২৪ কোপা আমেরিকা ও প্যারিস অলিম্পিক এবং ২০২৫ সালের ঐতিহাসিক ৩২ দলের ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপেও ভিএআর কক্ষে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।

নারী রেফারিদের এই যাত্রা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। বহু বছর ধরে তাদের নানা ধরনের সামাজিক ও পেশাগত বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছে। অনেক সময় মাঠে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অযৌক্তিক সমালোচনাও সহ্য করতে হয়েছে। তবু তারা থেমে থাকেননি। কঠোর প্রশিক্ষণ, ফিটনেস পরীক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন।

বিশ্ব ফুটবলে নারী রেফারিদের ইতিহাসও বেশ সমৃদ্ধ। ফ্রান্সের স্টেফানি ফ্রাপার্ট, জাপানের ইয়োশিমি ইয়ামাশিতা এবং রুয়ান্ডার সালিমা মুকানসাঙ্গা ২০২২ সালের পুরুষ বিশ্বকাপে দায়িত্ব পেয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছিলেন। তাদের সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের নারী রেফারিদের জন্য পথ আরও সহজ করে দিয়েছে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে নারী রেফারিদের উপস্থিতি নতুন প্রজন্মের মেয়েদের জন্যও অনুপ্রেরণা। যারা ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হতে চায় কিন্তু খেলোয়াড় হওয়ার সুযোগ বা আগ্রহ নেই, তাদের জন্য রেফারিং একটি সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে সামনে আসছে। অনেক দেশেই এখন নারী রেফারি তৈরির জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের নারী ফুটবলাররা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করছেন। একইভাবে নারী রেফারিদের উন্নয়নেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কোনো নারী রেফারিকেও বিশ্বকাপের মঞ্চে দেখা অসম্ভব নয়।

/এসএকে


  বিষয়:   বিশ্বকাপ  মঞ্চ  নারী  রেফারি  ফুটবল  খেলা 


Loading...
Loading...
খেলা- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: