যুদ্ধের মাঝে ইরানিদের জীবন : স্বাভাবিকতার আড়ালে এক চরম অনিশ্চয়তার গল্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

যুক্তরাষ্ট্র- ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা তুমুল সামরিক সংঘাত এবং নতুন দফায় পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন

2026-06-10T10:46:59+00:00
2026-06-10T10:46:59+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
যুদ্ধের মাঝে ইরানিদের জীবন : স্বাভাবিকতার আড়ালে এক চরম অনিশ্চয়তার গল্প
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ১০:৪৬ এএম   (ভিজিট : ২৩)
সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় তেহরানের বাসিন্দারা ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে লড়াই করছেন। সংগৃহীত ছবি
যুক্তরাষ্ট্র- ইসরায়েলের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা তুমুল সামরিক সংঘাত এবং নতুন দফায় পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন এখন খাদের কিনারায়। যুদ্ধকালীন ক্ষয়ক্ষতি এবং আন্তর্জাতিক কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে দেশটির অর্থনীতি পুরোপুরি বিপর্যস্ত। রাজধানী তেহরানের অলিতে-গলিতে এখন সাধারণ মানুষের আড্ডার মূল বিষয়বস্তু— যুদ্ধ পরিস্থিতি আর বেঁচে থাকার কঠিন লড়াই। 

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে একটি শান্তি চুক্তির ইঙ্গিত দিচ্ছেন, ঠিক তখনই তেহরানের বাসিন্দারা এক অদ্ভুত দোলাচলের মধ্য দিয়ে তাদের জীবিকার জন্য বের হচ্ছেন। একদিকে শান্তির আশা, অন্যদিকে যে-কোনো মুহূর্তে সাইরেন বেজে ওঠার আতঙ্ক।  

পশ্চিম তেহরানের একটি করপোরেট অফিসে কর্মরত ৩৩ বছর বয়সি এক যুবক আল জাজিরাকে বলেন, ‘সোমবার দুপুরে হঠাৎ বিকট আওয়াজে সবাই চমকে উঠেছিল। প্রত্যেকেই মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখছিল, তবে কেউ আতঙ্কিত হয়ে অফিস থেকে বের হয়নি। এরপর রাতেও আরও দুটি বড় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে, মানুষ এই ভীতিকর পরিবেশেই অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে দেখে মনে হবে সব স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরের সত্যটা হলো— এখানে কোনো কিছুই স্বাভাবিক নয়, বরং সম্পূর্ণ উল্টো।’ 

মূলত, লেবাননের বৈরুতে আইআরজিসি বা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের ঘাঁটিতে হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল ইরান। এর জবাবে ইসরায়েলি বিমান বাহিনী তেহরানসহ বন্দর-ই মাহশাহরের একটি কৌশলগত পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্সে হামলা চালায়। 

ইসরায়েলি নেতারা যেখানে পরবর্তী বড় হামলার ছক কষছেন, সেখানে ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে লেবাননে আক্রমণ বন্ধ না হলে তারা আরও কঠোর জবাব দেবে। এর ওপর যোগ হয়েছে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনা, যা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে কড়া বার্তা দিয়েছে, করেছে পাল্টা হামলা।   

ভবিষ্যৎ নিয়ে ঘোর অস্পষ্টতা

তেহরানের একটি ক্যাফেতে কর্মরত এক ডিজিটাল মার্কেটার তরুণী জানান, ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন না। তার মতে, ‘উভয় পক্ষের অবস্থান সম্পূর্ণ দুই মেরুতে। একজন এক কথা বললে অন্যজন বলে তার বিপরীতটা। এমন পরিস্থিতিতে ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।’ 

একই সুর শোনা গেল স্থানীয় এক জিম প্রশিক্ষকের কণ্ঠেও। তিনি মনে করেন, বড় জোর আগামী ফুটবল বিশ্বকাপ বা কয়েক মাসের জন্য একটা সাময়িক যুদ্ধবিরতি হতে পারে। কিন্তু সেটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং সাধারণ মানুষের কষ্টকে আরও দীর্ঘায়িত করা মাত্র। 

অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ এবং টিকে থাকার সংগ্রাম

যুদ্ধের মাঠের চেয়েও বড় ধাক্কা এসেছে ইরানের বাজারে। লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি আর পণ্যের দামের ওঠানামার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তদের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। তেহরানের এক ক্যাফে মালিক জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে তিনি মেন্যু থেকে বেশ কিছু আইটেম বাদ দিতে বাধ্য হয়েছেন। মাত্র তিন সপ্তাহ আগের তুলনায় কফির পাইকারি দাম আড়াই গুণ বেড়েছে, যা চার বছর আগের তুলনায় প্রায় ২০ গুণ বেশি! 


স্থানীয় কসাই, রুটিওয়ালা থেকে শুরু করে মুদি দোকানি— সবার মুখে একই হাহাকার। বাজারে পণ্যের দাম এত দ্রুত বাড়ছে যে, বিক্রেতারা সকালের লাভে বিকেলের পণ্য কিনতে পারছেন না। অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি একে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। মে মাসের শেষ নাগাদ দেশে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি ৮৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে এবং খাদ্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি পৌঁছেছে আকাশচুম্বী ১৩০ শতাংশে। তেল ও ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম গত বছরের তুলনায় চার গুণ বেড়েছে।

ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট ও সামাজিক অস্থিরতা

এদিকে সামরিক উত্তেজনার পারদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইরানিদের মধ্যে নতুন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে। যে-কোনো মুহূর্তে সরকার ইন্টারনেট ব্লক করে দিতে পারে— এই আশঙ্কায় অনেকেই আগেভাগে ভিপিএন কিনে রাখছেন। মে মাসের শেষের দিকে আংশিক ইন্টারনেট সেবা চালু করা হলেও গতি অত্যন্ত সীমিত। সরকারের কট্টরপন্থী অংশ অবশ্য যুদ্ধকালীন এই পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বজায় না রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনের সমালোচনাও করছে।

এত সব অনিশ্চয়তা আর অর্থনৈতিক কষ্টের মাঝেও তেহরানের রাস্তায় রাতে দেখা মিলছে রাষ্ট্রপন্থীদের। সরকারি নিরাপত্তা বেষ্টনীর ভেতরে জড়ো হয়ে তারা এখনো আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে স্লোগান দিচ্ছে, ওড়াচ্ছে পতাকা। তবে এই স্লোগানের আড়ালে কি চাপা পড়ে যাচ্ছে কিছু?

সূত্র : আল জাজিরা  

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   মার্কিন যুদ্ধ  ইরানিদের জীবন  চরম অনিশ্চয়তা 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: