গাজা উপত্যকার পর এবার দক্ষিণ লেবাননেও এক নৃশংস মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এবং তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে আনতে ইসরায়েলি ড্রোন বা কোয়াডকপ্টারগুলো থেকে ছড়ানো হচ্ছে শিশুদের কান্না ও নারীদের আর্তনাদের শব্দ।
লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় হাব্বুশ গ্রামের বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মী হাশেম জানান, সম্প্রতি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে মাথার ওপর উড়তে থাকা ইসরায়েলি ড্রোন থেকে শিশুদের কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে।
‘মিডল ইস্ট আই’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এটি কোনো একক ঘটনা নয়; বরং প্রতিনিয়ত তারা এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন। কখনো অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, কখনো পবিত্র কুরআনের তিলওয়াত, আবার কখনো কোনো নারীর সাহায্যের আকুতি লাউডস্পিকারের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, তীব্র বোমাবর্ষণের পরও যারা নিজ ভিটেমাটিতে রয়ে গেছেন, তাদের ভয় দেখাতে এবং মানসিক চাপ সৃষ্টি করতেই এই ফাঁদ তৈরি করা হয়েছে। রাতের বেলা এমন আর্তনাদ শুনলে মানুষের স্বাভাবিক মানবিক প্রবৃত্তি হলো সাহায্য করতে বাইরে যাওয়া। আর ঠিক তখনই ফাঁদে পা দেওয়া ব্যক্তিদের ড্রোন দিয়ে শনাক্ত বা লক্ষ্যবস্তু করা সহজ হয়।
গাজার কৌশলের পুনরাবৃত্তি
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এই অমানবিক কৌশলটি ইসরায়েলের জন্য নতুন নয়। এর আগে গাজা যুদ্ধের সময়ও শরণার্থী শিবির ও আবাসিক এলাকায় গভীর রাতে ড্রোন থেকে শিশুদের কান্না ও নারীদের চিৎকার বাজানো হতো। গাজায় এই কোয়াডকপ্টারগুলো শুধু নজরদারি নয়, বরং গুলি চালানো এবং সাধারণ মানুষের মানবিক অনুভূতিকে ভোঁতা করে দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। এখন ঠিক একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে লেবাননের সীমান্ত এলাকায়।
শব্দ দিয়ে সমাজ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা
যুদ্ধের এই মনস্তাত্ত্বিক রূপটি কেবল কান্নার শব্দেই সীমাবদ্ধ নয়। দক্ষিণ লেবাননের হুলার বাসিন্দা তারেক মাজানি জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি ড্রোন থেকে তার নাম উল্লেখ করে মাইকিং করা হয় এবং তাকে হিজবুল্লাহর সদস্য দাবি করে প্রতিবেশীদের তাকে বয়কট করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বারবার বাস্তুচ্যুত হওয়া মাজানি বলেন, মূলত যারা উচ্ছেদের বিরোধিতা করছেন বা পুনর্বাসনের দাবি তুলছেন, তাদের সামাজিকভাবে একঘরে ও আতঙ্কিত করতেই ইসরায়েলি বাহিনী এই পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
দক্ষিণ লেবাননের এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, যুদ্ধ এখন কেবল ক্ষেপণাস্ত্র আর বোমাবর্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা মানুষের মানসিক পরিমণ্ডল ও শ্রবণশক্তির ওপর আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। এই কৃত্রিম শব্দের ফাঁদ বেসামরিক মানুষকে এক চরম দোটানায় ফেলে দিয়েছে— আর্তনাদে সাড়া দিলে মৃত্যুর ঝুঁকি, আর সাড়া না দিলে বিবেক দংশন। আর এই সুযোগেই স্থানীয়দের মাঝে পারস্পরিক বিশ্বাস নষ্ট করার চেষ্টা চালাচ্ছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী।
সময়ের আলো/জেডি