জ্বালানি অস্থিতিশীলতার নতুন হাতিয়ার ‘এআই গুজব’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার কি বিশ্বজুড়ে পরবর্তী বড় জ্বালানি সংকট ডেকে আনতে পারে? যুদ্ধবিগ্রহ, ভূ-রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা নৌপথের

2026-06-10T12:14:08+00:00
2026-06-10T13:31:50+00:00
 
  বুধবার, ১০ জুন ২০২৬,
২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আন্তর্জাতিক
জ্বালানি অস্থিতিশীলতার নতুন হাতিয়ার ‘এআই গুজব’
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬, ১২:১৪ পিএম  আপডেট: ১০.০৬.২০২৬ ১:৩১ পিএম  (ভিজিট : ২০)
সংগৃহীত ছবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার কি বিশ্বজুড়ে পরবর্তী বড় জ্বালানি সংকট ডেকে আনতে পারে? যুদ্ধবিগ্রহ, ভূ-রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কিংবা নৌপথের অবরোধের কারণে তেলের বাজার সবসময়ই সংবেদনশীল। 

তবে বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এমন এক অদৃশ্য হুমকির বিষয়ে সতর্ক করছেন, যা মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেলের দাম আকাশচুম্বী করে দিতে পারে। আর সেই হুমকিটি হলো— এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে ছড়ানো অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ‘ভুল তথ্য’ এবং ‘বিভ্রান্তিকর প্রোপাগান্ডা’। 

আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, ‘ভুল তথ্য’ হলো কোনো অসচেতন ভুল বা তথ্যের সঠিক উপস্থাপনার অভাব; অন্যদিকে ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ হলো জেনেশুনে বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাউকে বিভ্রান্ত করার জন্য ছড়ানো মিথ্যা। 

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তেল ব্যবসায়ীরা প্রায়শই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খণ্ডিত খবরের ওপর ভিত্তি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। এই সুযোগেই ডালপালা মেলছে এআই-সৃষ্ট ডিজিটাল কারসাজি। বাজারকে প্রভাবিত করার জন্য একটি মনগড়া খবরকে সত্য হওয়ার প্রয়োজন নেই; অ্যালগরিদম ও ট্রেডারদের পকেট কাটার জন্য এটিকে কেবল কিছুক্ষণ ‘বিশ্বাসযোগ্য’ মনে হওয়াই যথেষ্ট।

তেলের বাজার কেন এত সহজ লক্ষ্যবস্তু?

অপরিশোধিত তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহের খবরের ওপর মারাত্মকভাবে ওঠানামা করে। কোনো তেলের পাইপলাইনে হামলা, ট্যাংকারের সংঘর্ষ কিংবা শোধনাগারে অগ্নিকাণ্ডের খবর আসার সঙ্গে সঙ্গে পেন্টাগন বা সেন্টকমের আনুষ্ঠানিক বিবৃতির অপেক্ষা না করেই সেকেন্ডের মধ্যে দাম বাড়তে শুরু করে। 

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০১৩ সালে হ্যাকাররা মার্কিন সংবাদ সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস’ (এপি)-এর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হ্যাক করে হোয়াইট হাউসে বিস্ফোরণ ও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আহত হওয়ার মিথ্যা খবর ছড়িয়েছিল। খবরটি ভুয়া প্রমাণিত হওয়ার আগেই মাত্র কয়েক মিনিটে মার্কিন শেয়ার বাজার থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধন হাওয়া হয়ে যায়। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ও রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ছড়ানো গুজবে তেলের বাজারে চরম অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। 


বর্তমান যুগে জেনারেটিভ এআই এই ঝুঁকিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার সময় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করে এমন কিছু ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়, যা আসলে ছিল সম্পূর্ণ কম্পিউটারে তৈরি বা অন্য কোনো ঘটনার বিকৃত রূপ। ফ্যাক্টচেকাররা সত্যতা প্রকাশ করার আগেই কোটি কোটি মানুষ তা দেখে ফেলে। জ্বালানি খাতের আশঙ্কা— যদি কোনো নিখুঁত ডিপফেক বা এআই ভিডিওতে কোনো বড় শোধনাগার বা হরমুজ প্রণালীতে ট্যাঙ্কার বহরে সফল হামলার দৃশ্য দেখানো হয়, তবে সত্য প্রকাশের আগেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস নেমে যাবে।

প্রযুক্তির লড়াই : যেভাবে রুখে দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল মিথ্যা

প্রতিদিন বিশ্বে কোটি কোটি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও তৈরি হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষ তো বটেই, বিশেষজ্ঞরাও আসল-নকলের পার্থক্য করতে হিমশিম খাচ্ছেন। এই সংকটের সমাধান করতে ও আর্থিক বাজার রক্ষা করতে এখন বিশ্বজুড়ে রিয়েল-টাইম ডিজিটাল তথ্য যাচাইকরণ প্রযুক্তির কদর বাড়ছে।

কানাডার ভ্যাঙ্কুভার-ভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘হাইডাওয়ে ডিজিটাল’ এই ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা বাজারে এনেছে ‘রিয়ালিটিচেক’ প্ল্যাটফর্ম এবং ‘ডিটেক্ট’ (DETECT) ভেরিফিকেশন নামক সত্যতা যাচাইকরণ টুল। তাদের সিইও কার্ল কটমায়ার বলেন, “এআই-নির্মিত কনটেন্টের কারণে মিথ্যা এখন আগের চেয়ে বেশি মূলধারায় পরিণত হয়েছে।” 

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তাদের প্ল্যাটফর্মটি একই সাথে ছবি, ভিডিও ও অডিওর পিক্সেল-স্তরের অসংগতি, মেটাডেটা, ফ্রিকোয়েন্সি এবং কম্প্রেশন প্যাটার্ন নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে। লক্ষ লক্ষ লেবেলযুক্ত আসল ও নকল কনটেন্টের ডেটাবেজ ব্যবহার করে এই এআই মডেলটিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যা যে-কোনো কারসাজি মুহূর্তের মধ্যে ধরে ফেলতে পারে। এ ছাড়া কন্টেন্টের উৎস নিশ্চিত করতে ক্রিপ্টোগ্রাফিক ভেরিফিকেশন এবং ব্লকচেইনভিত্তিক প্রমাণীকরণ ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। 

সামনের দিনে তথ্যের চেয়েও দামি সত্যতা

বিখ্যাত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ‘গ্লোব অ্যান্ড মেইল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং ফরেনসিক টুলের সমন্বয়ে তৈরি এই ‘ডিটেক্ট’ প্ল্যাটফর্মটি আগামী দিনে তেল ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী এবং সরকারগুলোর জন্য একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। 

এমন এক যুগে আমরা প্রবেশ করেছি যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মিনিটের মধ্যে সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত জগৎ তৈরি করতে পারে। তাই আগামী দিনে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের পরবর্তী বড় ধাক্কাটি হয়তো কোনো আসল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে আসবে না, বরং আসতে পারে এমন এক বিশ্বাসযোগ্য ডিজিটাল জালিয়াতি থেকে যা সত্যের চেয়েও দ্রুত পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে। 

আর এ কারণেই দ্রুত তথ্য যাচাইয়ের ক্ষমতাই এখন বিশ্ব অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   তেলের বাজার  অস্থিতিশীলতা  নতুন হাতিয়ার  এআই গুজব 


Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: