মিয়ানমারের গভীর জঙ্গল ও পাহাড়ি অঞ্চলের বিদ্রোহী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া চার যুবকের গল্পটা প্রায় একই রকম। তারা কেউ স্বেচ্ছায় অস্ত্র হাতে তুলে নেয়নি, এমনকি সামরিক জান্তার হয়ে যুদ্ধ করার কোনো ইচ্ছাও তাদের ছিল না। তাদের একজন ছিলেন পেশায় রাঁধুনি, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা থেকে তাকে তুলে নেয় সেনাবাহিনী।
অন্যজনকে কারাওকে বার থেকে এবং অপরজনকে বন বিভাগের ডিউটি থেকে গ্রেফতার করে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। চতুর্থ যুবকের জুতোয় মাদক ঢুকিয়ে ফাঁসিয়ে দিয়ে সামরিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
১৯ থেকে ২৫ বছর বয়সি এই যুবকদের একজন বিবিসিকে বলেন, ‘কী ঘটছে কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাদের সরাসরি সম্মুখ সমরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।’ তারা চার মাস প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষে কারেন রাজ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর পর এক রাতে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে পালানোর পর তারা বিদ্রোহী গোষ্ঠী পিপলস ডিফেন্স ফোর্স (পিডিএফ)-এর টহল দলের হাতে আটক হন। বর্তমানে তারা থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছাকাছি পিডিএফ শিবিরের আশ্রয়ে রয়েছেন।
এই চার যুবকের মতো হাজার হাজার তরুণকে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে যুক্ত করার জান্তা সরকারের নীতিটি মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধে এক বড় পরিবর্তনের অনুঘটক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২১ সালে অং সান সু চির গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করা সামরিক জান্তা গত দুই বছর ধরে বিদ্রোহীদের একের পর এক হামলায় কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল।
কিন্তু নতুন এই বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ আইনের ফলে যুদ্ধের ময়দানে জান্তা বাহিনী আবার সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছে এবং বিদ্রোহীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ছে প্রতিনিয়ত।
তরুণ জনবল ও প্রযুক্তিগত সুবিধা
অনুমতি ছাড়াই মিয়ানমারের বাগো ও কারেন রাজ্যের বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘুরে এসে তৈরি করা এই প্রতিবেদনে বিবিসির প্রতিনিধিরা দেখিয়েছেন, কীভাবে যুদ্ধের পাল্লা আবার জান্তার দিকে ভারী হচ্ছে। পিডিএফ ব্যাটালিয়ন কমান্ডার কো কাউং জানান, ২০২৪ সালে জান্তা সরকার বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা আইন কার্যকর করার পর থেকেই তাদের অগ্রযাত্রা থমকে গেছে।
তিনি বলেন, ‘এই আইনটি সেনাবাহিনীকে অফুরন্ত জনবল জুগিয়েছে, যা এখন আমাদের জন্য প্রধান বাধা। আমাদের জনবল ও তহবিল দুটিই সীমিত।’
দুই বছর আগে বিদ্রোহীরা কারেন রাজ্যের হপাপুন শহরের একটি বিশাল সামরিক ঘাঁটি দখল করে নিয়েছিল। তবে বর্তমানে আকাশজুড়ে জান্তার ড্রোন উড়ছে এবং প্রায় ২,০০০ সৈন্য হপাপুন পুনর্দখলের জন্য এগিয়ে আসছে।
পাহাড়ি শিবিরের আরেক পিডিএফ কমান্ডার দা ওয়া স্বীকার করেন যে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেনাবাহিনীতে আসা এই নতুন সৈন্যরা এখন আদেশের প্রতি বেশ অনুগত এবং যোদ্ধা হিসেবে আগের চেয়ে উন্নতি করছে। এছাড়া রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির পর জান্তার বিমান ও ড্রোন শক্তি বহুগুণ বেড়েছে। আগে যেখানে একটি যুদ্ধবিমান আসত, এখন সেখানে জোড়ায় জোড়ায় বিমান ও আধুনিক ড্রোন দিয়ে নিখুঁত হামলা চালানো হচ্ছে।
অস্ত্রের সংকট ও ল্যান্ডমাইনের ক্ষত
জান্তা বাহিনীর এই আগ্রাসনের মুখে বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদের তীব্র সংকট। যুদ্ধের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক প্লাটুন কমান্ডার তার অতি-উৎসাহী যোদ্ধাকে চিৎকার করে বলছেন, ‘গুলি বাঁচাও, শান্ত হও!’
লড়াইয়ে ল্যান্ডমাইনের আঘাতে ডান পা হারানো প্লাটুন কমান্ডার কিয়ার সো জঙ্গল ক্লিনিকের বিছানায় শুয়ে বলেন, ‘আমাদের গোলাবারুদের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। তবে আমরা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।’
উল্লেখ্য, মিয়ানমার বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম মাইন-আক্রান্ত দেশ, যেখানে গত এক বছরেই প্রায় ৭৪৫ জন মানুষ ল্যান্ডমাইনের শিকার হয়েছেন।
এর পাশাপাশি, চীনের মধ্যস্থতায় বেশ কয়েকটি বড় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে জান্তার যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার ফলে প্রতিরোধ বাহিনীগুলোর কাছে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের পথ আরও রুদ্ধ হয়ে গেছে।
একটি স্বাধীন আগামীর স্বপ্ন দেখছে তারা
স্বল্প বাজেটে বাঁশ ও কাঠের তৈরি একটি ফিল্ড হাসপাতাল চালান ডক্টর সাউং, যিনি নিজে একসময় সামরিক একাডেমিতে ১৯ বছর কাটিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আগের প্রজন্ম স্বৈরাচারের হাত থেকে দেশকে মুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিল বলেই আজ এই যুবকদের অস্ত্র ধরতে হচ্ছে। তরুণরা যদি এখন প্রতিরোধ না করে, তবে ভবিষ্যতেও এই নিপীড়ন চলতেই থাকবে।’
এই যুদ্ধক্ষেত্রের বিভীষিকার মাঝেই ডক্টর সাউংয়ের হাসপাতালে এক নারী যোদ্ধার কোল আলো করে জন্ম নেয় একটি শিশুকন্যা। দমবন্ধ করা গরমে মোবাইল ফোনে বৌদ্ধ মন্ত্র বাজিয়ে স্ত্রীর প্রসব বেদনা কমানোর চেষ্টা করছিলেন ২৪ বছর বয়সি তরুণ যোদ্ধা ইনে চিট। সদ্যোজাত মেয়ের নাম রাখা হয়েছে ‘স্যু পায়ে’, যার অর্থ ‘পূর্ণ ইচ্ছা’।
নিজের এলাকাটি এখনো সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে থাকায় বাবা-মায়ের কাছে মেয়েকে নিয়ে যেতে পারছেন না ইনে চিট। তবে মেয়ের ভবিষ্যতের কথা জিজ্ঞেস করতেই এই বিদ্রোহী যোদ্ধা দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমি তার জন্য একটি মুক্ত, স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক মিয়ানমার চাই। বিপ্লব শেষ হলে একদিন আমরা সবাই শান্তিতে বাড়ি ফিরব।’
সূত্র : বিবিসি
সময়ের আলো/জেডি