মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেছিলেন, ইরানের ওপর একটি সর্বাত্মক বিজয় মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে তাদের মনের মতো করে পুনর্গঠন করবে। অঞ্চলটি আসলেই পুনর্গঠিত হচ্ছে, তবে তা ওয়াশিংটন বা তেল আবিবের প্রত্যাশামতো নয়। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে পরাস্ত করা তো দূররস্ত, উল্টো পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন এক দীর্ঘস্থায়ী, ক্ষয়িষ্ণু ও মারাত্মক ‘পারমাক্রাইসিস’ বা স্থায়ী সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে; যা যেকোনো মুহূর্তে এক মহাবিপর্যয়কর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
কূটনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, তেহরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি শক্ত প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের রণকৌশলগত ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পরিস্থিতি এখন তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। যার সর্বশেষ প্রমাণ— ইরানের মাটিতে মার্কিন অত্যাধুনিক ‘অ্যাপাচে’ সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনা। এই ঘটনা ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, ইরানি শাসকরা এখনো মার্কিন বাহিনীকে তীব্র আঘাত করার ক্ষমতা রাখে এবং এই যুদ্ধে যেকোনো মূল্যে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে তারা বদ্ধপরিকর। তেহরানের কাছে এই যুদ্ধের জয় মানেই হলো তাদের নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’র ওপর নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।
পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউস এখন এই হেলিকপ্টার ধ্বংসের ঘটনায় তাদের সামরিক প্রতিক্রিয়া কেমন হবে, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে। একদিকে মার্কিন জেনারেলরা দেখাতে চান, ওয়াশিংটনকে এভাবে ধাক্কা দেওয়া যাবে না, অন্যদিকে তারা ওমান বা কাতারের মধ্যস্থতায় চলা ধীরগতির কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকেও বাঁচিয়ে রাখতে চান। সৌভাগ্যবশত অ্যাপাচে হেলিকপ্টারের ক্রু বা আরোহীরা বেঁচে গেছেন; তারা নিহত হলে মার্কিন বাহিনী হয়তো আরও বিধ্বংসী ও নির্মম কোনো পাল্টা হামলা চালাত।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সাথে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যাতে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া যায় এবং ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ও পারমাণবিক পরিকল্পনা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা শুরু করা যায়। আমেরিকার অভ্যন্তরে এই যুদ্ধ চরম অজনপ্রিয় এবং ট্রাম্প এমন একটি উপায় খুঁজছেন যা দেশের মানুষের কাছে ‘বিজয়’ হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি এই যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসতে পারেন। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা তার এই আকাঙ্ক্ষাকে এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
ইতিহাসের এক পুরোনো নির্মম শিক্ষা নতুন করে শিখছেন ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। মানবসভ্যতায় যুদ্ধের সূচনা থেকেই শাসকরা দেখে এসেছেন, একটি যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, একটি সুনির্দিষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ঠিক ততটাই কঠিন। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে যখন তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন, তখন উভয়ের ভিডিও বার্তাতেই অহংকার ও এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের আত্মবিশ্বাস ঝরে পড়ছিল। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে চলে আসা ইরানি শাসনব্যবস্থার পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র— এমনটাই ভেবেছিলেন তারা।
ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্ট থেকে দেওয়া গভীর রাতের ভাষণে ট্রাম্প ইরানি সরকারবিরোধীদের প্রতিশ্রুত ‘সাহায্য আসছে’ উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘ইরানের গর্বিত নাগরিকরা, আপনাদের মুক্তির সময় সমাগত। ঘরে থাকুন, বাইরে অত্যন্ত বিপজ্জনক পরিস্থিতি। সব জায়গায় বোমা পড়বে। আমাদের কাজ শেষ হলে আপনারা সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেবেন।’ ঠিক তার পরের দিন সকালে তেল আবিবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাদ থেকে নেতানিয়াহু ঘোষণা করেছিলেন, ‘এই মহাশক্তিধর জোট আমাদের সেই সুযোগ করে দিয়েছে যার জন্য আমি ৪০ বছর ধরে অপেক্ষা করছি— সন্ত্রাসী বাহিনীকে গুঁড়িয়ে দেওয়া। আমি যা ওয়াদা করেছিলাম, তা-ই করব।’
নেতানিয়াহু তার পুরো রাজনৈতিক জীবনেই দাবি করে এসেছেন, ইসরায়েলের আসল শত্রু ফিলিস্তিন বা আরব প্রতিবেশীরা নয়, বরং ইরান। তিনি পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ইরানে হামলার জন্য রাজি করাতে ব্যর্থ হলেও ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সফল হন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলে আসছিলেন, মার্কিন সহায়তায় তাদের সামরিক শক্তি সমস্ত শত্রুকে ধ্বংস করে এক নিরাপদ ভবিষ্যৎ এনে দেবে। তার কাছে কূটনীতি নয়, সামরিক শক্তিই ছিল একমাত্র সমাধান।
কিন্তু সেই আক্রমণাত্মক নেতানিয়াহুকে গত সোমবার যখন ট্রাম্প বৈরুতে হামলা বাতিলের নির্দেশ দেন, তখন ইসরায়েলের শীর্ষ কলামিস্ট বেন ক্যাসপিটের মতে, তাকে একটি ‘ফুসফুস ফেটে যাওয়া বেলুনের’ মতো দেখাচ্ছিল। নেতানিয়াহুর শক্তিপ্রয়োগের নীতি যে মধ্যপ্রাচ্যে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, তা এখন স্পষ্ট।
ট্রাম্প ভেবেছিলেন ভেনেজুয়েলার মতো দ্রুত একটি বিজয় পাবেন, যেখানে মার্কিন সামরিক বাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্ট ও তার স্ত্রীকে ধরে নিউইয়র্কের জেলে পুরে দিয়েছিল এবং কারাকাসে এক অনুগত পুতুল সরকারকে বসিয়েছিল। ট্রাম্পের চোখে এটিই ছিল ‘টেক্সটবুক রেজিম চেঞ্জ’, যা ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের চেয়ে অনেক সহজ। কিন্তু ইরানকে সেই তালিকায় রাখা ছিল মার্কিন প্রশাসনের এক মস্ত বড় ভুল।
আমেরিকা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের পরমাণু সমৃদ্ধ পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও কেন এই বিপর্যয় ঘটল? ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দেখেছিলেন যে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সংকটে তেহরান জর্জরিত। ইসরায়েলের হামলায় গাজার হামাস এবং লেবাননের হিজবুল্লাহর মতো ইরানের প্রক্সি বা মিত্ররা চরম কোণঠাসা। তাদের অন্যতম প্রধান মিত্র সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মস্কোতে পালিয়ে গেছেন। গত জানুয়ারিতেই হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে দেশের অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমন করেছে তেহরান।
এত কিছুর পরও তারা ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার সহনশীলতা, নির্মমতা ও যুদ্ধকৌশলকে অবমূল্যায়ন করেছিলেন। তারা ভেবেছিলেন সর্বোচ্চ নেতা এবং তার শীর্ষ কমান্ডারদের হত্যা করলেই হয়তো ইরান ভেতর থেকে ভেঙে পড়বে। কিন্তু গত ৫০ বছর ধরে ক্রমাগত বৈশ্বিক হুমকির মুখে টিকে থাকা একটি ধর্মীয় ও আদর্শিক রাষ্ট্র যে নিজেদের সুরক্ষার জন্য কতটা নিখুঁত সামরিক অবয়ব তৈরি করেছে, তা বুঝতে ওয়াশিংটন ও তেল আবিব সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
এই যুদ্ধের ধাক্কায় আমেরিকার মিত্র পারস্য উপসাগরীয় ধনী তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো (যেমন আরব আমিরাত ও বাহরাইন) এখন চরম অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। পেট্রোকেমিক্যাল ও সার রপ্তানির রাজস্ব হারানোর চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে তাদের সুনামের। তারা মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসার যে ‘স্থিতিশীল মরূদ্যান’ গড়ে তুলতে চেয়েছিল, এই যুদ্ধের আগুনে পর্যটক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে তা আজ মরীচিকায় পরিণত হয়েছে।
তেহরানের নতুন নেতৃত্ব- যারা নিহত পুরোনো নেতাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন, তারা আগের চেয়েও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক এবং যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি আগ্রাসনের এমন এক বেদনাদায়ক জবাব দিতে চান যা ভবিষ্যতে তাদের ওপর আর কোনো হামলার সাহস জোগাবে না। ইরানের এই কৌশলের প্রধান অংশ হলো লেবাননের যুদ্ধকে পারস্য উপসাগরের যুদ্ধের সাথে জুড়ে দেওয়া। ট্রাম্পের প্রতি তেহরানের স্পষ্ট বার্তা— লেবাননে হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার ইসরায়েলি অভিযান বন্ধ না হলে হরমুজ প্রণালী খোলার কোনো চুক্তি হবে না।
ট্রাম্প ইতিমধ্যেই লেবানন ও উপসাগরীয় যুদ্ধের এই সংযোগকে পরোক্ষভাবে মেনে নিয়ে নেতানিয়াহুকে বৈরুতে হামলা বন্ধ করতে বাধ্য করেছেন। যদিও নেতানিয়াহু গর্জে উঠে বলেছেন, ‘এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।’ কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর আসল সমস্যা হলো— নেতানিয়াহুর যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার চেয়ে ট্রাম্প নিজের স্বার্থ এবং যুদ্ধ শেষ করার ইচ্ছাকেই বেশি প্রাধান্য দেবেন।
গত মার্চ মাসে যখন হরমুজ প্রণালী বন্ধ করা হয়েছিল, তখন বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল, যদি জুন মাসের মধ্যে তা খুলে দেওয়া না যায়। আজ জুনের মাঝামাঝি সময়ে এসেও বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই তেল পরিবহন জলপথটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ।
/কহু