জাতীয় নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫ অনুসরণ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীর অবিলম্বে কর্মস্থলে পদায়নের দাবি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করার একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ প্রকাশ এবং নতুন করে যুক্ত করা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যার দাবি তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। এই নিয়োগ জটিলতার দ্রুত ও স্থায়ী অবসান ঘটাতে চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থীরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বুধবার (১০জুন) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বা জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষকদের পক্ষ থেকে এসব দাবি উত্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে চূড়ান্ত নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পর দীর্ঘ প্রায় পাঁচ মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও এই ১৪ হাজার ৩৮৪ জন যোগ্য প্রার্থীকে এখনো কোনো বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এর ফলে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার পরিবার বর্তমানে তীব্র আর্থিক, সামাজিক এবং মানসিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে।
অনেক চাকরিপ্রার্থী প্রাথমিক শিক্ষক হিসেবে যোগদানের নিশ্চিত আশায় তাদের আগের কর্মসংস্থান ছেড়ে দিয়েছেন, আবার অনেকেই এই নিয়োগের অপেক্ষায় নতুন কোনো চাকরিতে আবেদন করেননি। ফলশ্রুতিতে লিখিত ও মৌখিকসহ সব ধরনের কঠিন পরীক্ষা সফলভাবে পাস করার পরও বিপুল সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী এখন পুরোপুরি বেকার হয়ে দিন কাটাচ্ছেন। প্রাথমিক শিক্ষা খাতের ইতিহাসে চূড়ান্ত সুপারিশের পর এভাবে মাসের পর মাস পদায়ন ঝুলিয়ে রাখার এমন নজিরবিহীন দীর্ঘসূত্রতা আগে কখনো দেখা যায়নি।
আন্দোলনরত শিক্ষকেরা স্পষ্ট করেছেন যে তারা সরকারের কোনো পেশাগত বা বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের বিপক্ষে নন, কারণ যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই নিজেদের আরও দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। তবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করার পর নতুন করে কোনো মূল্যায়ন প্রক্রিয়া চালু করা কিংবা নিয়মের বাইরে নতুন কোনো শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হলে তা চাকরিপ্রার্থীদের মনে নতুন করে চরম অনিশ্চয়তার জন্ম দেবে।
এই কারণে তারা সরকারি বিধিমালা-২০২৫ অনুযায়ী প্রথমে সরাসরি বিদ্যালয়ে পদায়ন সম্পন্ন করার এবং পরবর্তীতে চাকরি বজায় রেখেই সব ধরনের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ধাপে ধাপে শেষ করার দাবি জানিয়েছেন। এর পাশাপাশি গর্ভবতী কিংবা সদ্য সন্তান জন্মদানকারী নারী শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট ও মানবিক নীতিমালা প্রণয়নেরও অনুরোধ জানান তারা।
নিয়োগ প্রত্যাশীরা আরও উল্লেখ করেন যে দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো বর্তমানে তীব্র শিক্ষক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যার কারণে শিশুদের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত এই সাড়ে ১৪ হাজার নতুন শিক্ষককে দ্রুত কাজে যোগদানের সুযোগ দিলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংকট যেমন অনেকাংশে দূর হবে, ঠিক তেমনি এই বিপুল সংখ্যক বেকার পরিবারও দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও কষ্ট থেকে মুক্তি পাবে।
তারা অভিযোগ করেন যে পূর্বে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কেবল পুলিশ ভেরিফিকেশন বা চারিত্রিক সনদপত্র যাচাই শেষেই নিয়োগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। তবে এখন সম্পূর্ণ নতুনভাবে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বা ‘এনএসআই রিপোর্ট’ এর শর্তটি সামনে আনা হয়েছে যা অতীতে প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগের স্বাভাবিক নিয়মে কখনই ছিল না।
পুলিশি তদন্ত সফলভাবে শেষ হওয়ার পরও নতুন করে এই অতিরিক্ত গোয়েন্দা তদন্তের ধাপ যুক্ত করার আসল কারণ জানতে চেয়েছেন প্রার্থীরা। তাদের আশঙ্কা, এই বাড়তি নিয়মটি কেবল নিয়োগ প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘায়িত ও বিলম্বিত করার একটি কৌশল মাত্র এবং এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক শিক্ষা কর্তৃপক্ষের একটি পরিষ্কার ও লিখিত ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে তারা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে সুনির্দিষ্ট তিনটি দাবি পেশ করেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫ মেনে অবিলম্বে ১৪ হাজার ৩৮৪ জন সহকারী শিক্ষকের বিদ্যালয়ে পদায়ন নিশ্চিত করা, এনএসআই রিপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতার একটি স্পষ্ট ও লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া এবং পুরো নিয়োগ কার্যক্রম নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার জন্য একটি পরিষ্কার রোডম্যাপ বা সময়সূচি ঘোষণা করা।
প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুপারিশপ্রাপ্ত চূড়ান্ত প্রার্থীরা আবেগঘন কণ্ঠে জানান যে তারা কোনো ধরনের আন্দোলন বা রাজপথে থাকতে চান না, বরং তাদের আসল জায়গা হলো শ্রেণিকক্ষ। দেশের কোনো জায়গায় অপ্রীতিকর অস্থিরতা সৃষ্টি না করে তারা কেবল নিজেদের মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন এবং জাতি গঠনের মহৎ কাজে সরাসরি আত্মনিয়োগ করতে চান।
সময়ের আলো/টিএইচ