সাধারণত অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে দায়িত্ব পালন করা এসব সরকার ভোট আয়োজনের পাশাপাশি অর্থনীতির চাকা সচল রাখা, উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখা এবং জনগণের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করার কাজও ছিল। এসব সরকারগুলোর বাজেট তাই শুধু আর্থিক দলিল নয়, রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত চার অর্থবছরে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে : ১৯৯৬-৯৭, ২০০৭-০৮, ২০০৮-০৯ ও ২০২৫-২৬।
১৯৯৬-৯৭ অর্থবছর : ১৯৯৬ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে দেশের প্রথম সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ ১৯৯৬ সালের ২০ জুন ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরের অন্তর্বর্তীকালীন বাজেটটি পেশ করেন।
বাজেটে মোট বরাদ্দ ছিল ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয় ১৭ হাজার ১২০ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ছিল ৮ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর সংযত চরিত্র। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতুন কোনো বড় কর আরোপ করেনি, দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তনও আনেনি। রাষ্ট্র পরিচালনায় যেন কোনো শূন্যতা সৃষ্টি না হয় এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যাতে বন্ধ না হয়ে যায়, সেই লক্ষ্যেই বাজেটটি তৈরি করা হয়েছিল।
নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া এই বাজেটের মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রাখেন। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে সফল বাজেট ট্রানজিশনের উদাহরণগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে এই বাজেট ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ পেশ করলেও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জুলাই মাসে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে নতুন অর্থমন্ত্রী হন শাহ এ এম এস কিবরিয়া। তিনি ২৮ জুলাই ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বাজেট পরিকল্পনাটিই অপরিবর্তিত রেখে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়ে পেশ করেন।
২০০৭-০৮ অর্থবছর : ওয়ান-ইলেভেনের পর দুর্নীতি দমন ও খাদ্য নিরাপত্তার বাজেট
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রায় দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা ছিলেন ড. এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম।
৭ জুন ২০০৭ তিনি ৮৭ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার বাজেট উপস্থাপন করেন। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৫৭ হাজার ৩০১ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ছিল ২৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা।
এই বাজেটের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুর্নীতি দমন এবং অর্থনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ সীমিত করা হয়। একই সঙ্গে ২০০৭ সালের বৈশ্বিক খাদ্য সংকটের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষি খাতে ব্যাপক ভর্তুকি দেওয়া হয়।
সেই সময় দেশে চাল, গম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম দ্রুত বাড়ছিল। ফলে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ওএমএস কার্যক্রম জোরদার এবং খাদ্য সহায়তা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
২০০৮-০৯ অর্থবছর : সিডর-পরবর্তী পুনর্গঠন ও কর্মসংস্থানের বাজেট
২০০৮ সালের ৯ জুন ড. মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম দ্বিতীয় ও শেষ পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেটের আকার ছিল প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা, অর্থাৎ ৯৯ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ছিল ৭৫ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা এবং ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার ২৩৪ কোটি টাকা।
এই বাজেটের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার ছিল ঘূর্ণিঝড় সিডর ও বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা। উপকূলীয় অঞ্চলের পুনর্বাসন, গ্রামীণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং কৃষি পুনরুদ্ধারে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়।
একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো ১০০ দিনের কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা পরে বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে। গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ানো এবং মৌসুমি বেকারত্ব কমানোই ছিল এর মূল লক্ষ্য।
তিনটি বাজেটের মূল উদ্দেশ্য ছিল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা। নির্বাচিত সরকারের মতো বড় রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের পরিবর্তে এসব বাজেট গুরুত্ব দিয়েছে— অর্থনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা।
২০২৫-২৬ অর্থবছর : ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। এটি ছিল দেশের ৫৪তম জাতীয় বাজেট।
বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম। মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা এবং বাজেট ঘাটতি প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা।
এই বাজেটের মূল লক্ষ্য ছিল মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা। রাজস্ব আদায়ের বাস্তবতা এবং ঋণের চাপ বিবেচনায় নিয়ে ব্যয় সংকোচনের নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। এ কারণেই স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো জাতীয় বাজেটের আকার কমানো হয়েছে।
একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমাতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সময়ের আলো/আআ