‘দ্য লিটল ম্যাজিক ম্যান ফ্রম রাইট অন দ্য লাইন। অ্যান অ্যামব্যারেস অব ডিসবিলিফ। মেসি অ্যান্ড মিলিমিটার্স’-ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ইলিংশ কমেন্টেটর পিটার ড্রুরির বলা লাইনগুলো শুনলে যে কেউ শিহরিত হবেন। এটাই ছিল লিওনেল মেসির বিশ্বজয়ের পূর্ণতা। সেদিন ‘অ্যামব্যারেস অব ডিসবিলিফ’ অর্থাৎ কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল মেসি।
কিন্তু ফুটবল বিধাতা ২০২২ বিশ্বকাপের সেই রোমাঞ্চিত ফাইনালে মেসিকে আর বঞ্চিত করেননি। মেসিকে দুহাত ভরে দিয়েছেন। ২০০৬ বিশ্বকাপ থেকে শুরু, ২০২২-এ এসে তার পূর্ণতা। বিশ্বকাপ ট্রফিটা যদি কথা বলতে পারত; তা হলে নিশ্চয়ই আজ আমি সার্থক মেসির হাতের স্পর্শ পেয়ে।
আকাশি-সাদা রঙের প্রতিটা সুতোয় যে আবেগ লেপ্টে থাকে, তা হয়তো আর্জেন্টিনার বাইরে কারোর পক্ষে পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব। কিন্তু যখন সেই ১০ নম্বর জার্সিটা গায়ে জড়ান লিওনেল মেসি, তখন সেই আবেগ আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের সীমানায় আটকে থাকে না; তা হয়ে যায় গোটা পৃথিবীর, কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর হৃদয়ের স্পন্দন। ২০২৬ সালের এই মেক্সিকো, কানাডা আর আমেরিকার যৌথ মঞ্চে যখন মেসি শেষবারের মতো বিশ্বকাপের মাঠে পা রাখছেন, তখন বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। আমরা জানি, এটাই শেষ।
এই সবুজ গালিচায়, এই বিশ্বমঞ্চে আর কখনো দেখা যাবে না সেই চেনা দৌড়, সেই জাদুকরী ড্রিবলিং, আর গোল করার পর দুই হাত উঁচুতে তুলে আকাশের দিকে তাকানো চিরচেনা ভঙ্গি। ফুটবল বিধাতা যেন তার সবচেয়ে সুন্দর সৃষ্টিকে বিদায় জানানোর জন্য এক অলৌকিক ও বেদনাবিধুর এক মঞ্চ তৈরি করেছেন এই ২০২৬ সালে। বিশ্বকাপ ট্রফি ধরে রাখার লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে এক জীবন্ত কিংবদন্তির চিরতরে বিদায়ের এক পরম ও করুণ মুহূর্ত।
পেছনের দিনগুলোর দিকে তাকালে বুকটা কেমন যেন হু হু করে ওঠে। মনে পড়ে যায় ১৯৮৭ সালের সেই জুনের ২৪ তারিখের কথা, আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক হতদরিদ্র ঘরের সেই ছোট্ট ছেলেটার কথা, যার শরীরে বাসা বেঁধেছিল হরমোনের এক জটিল রোগ। যে বয়সে ছেলেদের মাঠে দাপিয়ে বেড়ানোর কথা, সেই বয়সে লিওকে লড়তে হয়েছিল নিজের অস্তিত্বের সঙ্গে।
অর্থাভাবে যখন চিকিৎসা বন্ধ হওয়ার উপক্রম, ঠিক তখনই ভাগ্যবিধাতা তাকে নিয়ে এলেন স্পেনের বার্সেলোনায়। সেই যে একটা টিস্যু পেপারে সই করে শুরু হয়েছিল এক নতুন ইতিহাস, তা আজ বিশ্বফুটবলের সবচেয়ে বড় মহাকাব্য। লা মাসিয়ার একাডেমি থেকে উঠে আসা সেই লাজুক, চুলে ঢাকা কপাল আর ছোটখাটো গড়নের ছেলেটি যখন ন্যু ক্যাম্পের মাঠে প্রথম বল পায়ে নামল, কে জানত সে ফুটবল খেলাটার সংজ্ঞাই বদলে দেবে।
বার্সেলোনার হয়ে কাটানো স্বর্ণালী দিনগুলো জাভি, ইনিয়েস্তার সঙ্গে সেই অবিশ্বাস্য বোঝাপড়া, প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে একাই খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেওয়া, আর এক ক্যালেন্ডার বছরে ৯১টি গোলের সেই অতিমানবীয় রেকর্ড- সবই যেন আজ স্মৃতির পাতায় এক একটা উজ্জ্বল চিত্র। কিন্তু ফুটবল কতটা নির্মম হতে পারে, তার প্রমাণ মিলল ২০২১ সালের সেই অভিশপ্ত দিনে, যখন প্রিয় বার্সেলোনা ছেড়ে চোখের জলে বিদায় নিতে হয়েছিল তাকে। ন্যু ক্যাম্পের সংবাদ সম্মেলন কক্ষে মেসির সেই কান্না ফুটবলবিশ্বের কোটি ভক্তের হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছিল।
অথচ এই মানুষটাকেই একটা সময় নিজের মাতৃভূমির মানুষের কাছে কী ভীষণ লাঞ্ছনা সহ্য করতে হয়েছিল। বার্সেলোনার হয়ে যখন একের পর এক ট্রফি জিতছেন, তখন আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির কপালে জুটেছিল কেবলই ব্যর্থতা আর সমালোচনা। দেশের মানুষ বলত, সে নাকি আর্জেন্টিনার জন্য মন থেকে খেলে না। মনের ভেতর জমানো সেই কষ্ট আর অভিমান কতটা গভীর ছিল, তা বোঝা গিয়েছিল ২০১৪ সালের ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে। জার্মানির কাছে ফাইনালে হেরে যাওয়ার পর, বিশ্বকাপের সেই গোল্ডেন বলটা হাতে নিয়ে ট্রফির পাশ দিয়ে মেসির হেঁটে যাওয়ার সেই ছবিটা আজও প্রতিটি ফুটবল ভক্তের বুকে তীরের মতো বিঁধে আছে। ট্রফিটার দিকে মেসির সেই তৃষ্ণার্ত দৃশ্য ছিল ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনার্ত দৃশ্য।
এরপর ২০১৫ আর ২০১৬ সালে পরপর দুবার কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যাওয়ার পর বুকভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন মেসি। মাঠের মধ্যেই উবু হয়ে বসে তার সেই কান্না দেখে কেঁদেছিল পুরো বিশ্ব। চরম হতাশায় আর অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবলকেই বিদায় জানিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফুটবল যার রক্তে, দেশের মানুষের ভালোবাসা যাকে টানে, সে কি দূরে থাকতে পারে? কোটি ভক্তের আকুতিতে আবার ফিরে এলেন নিজের চেনা ডেরায়, আকাশি-সাদা রঙে নিজেকে রাঙাতে।
অবশেষে ফুটবল-ঈশ্বর আর মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারেননি। দীর্ঘ ২৮ বছরের ট্রফির খরা কাটিয়ে ২০২১ সালে সেই ব্রাজিলের মাটিতেই কোপা আমেরিকা জয় করলেন মেসি। মারাকানার অভিশপ্ত মাঠেই ট্রফি জড়িয়ে ধরে যখন তিনি মাটিতে বসে কাঁদছিলেন, তখন সেই কান্না আর দুঃখের ছিল না, তা ছিল এক পরম প্রাপ্তির, মুক্তির আনন্দের অশ্রু। তারপর এলো ২০২২ সালের কাতারের সেই অমর রূপকথা। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হেরে যাওয়ার পর যেভাবে পুরো দলকে একাই পিঠে করে টেনে তুললেন, তা কেবল কোনো দেবদূতের পক্ষেই সম্ভব।
ফাইনালে এমবাপের ফ্রান্সের বিপক্ষে শ্বাসরুদ্ধকর, শতাব্দীর সেরা ফুটবল যুদ্ধ আর টাইব্রেকারের শেষ শটটির পর যখন আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো, তখন মনে হয়েছিল যেন পৃথিবীর সব ঋণ শোধ হয়ে গেছে। আলখাল্লা গায়ে জড়িয়ে যখন মেসি সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন, তখন ফুটবল খেলাটাই যেন ধন্য হয়েছিল। ৮টি ব্যালন ডি’অর, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা জেতার মতো আর কিছুই বাকি নেই তার। তিনি আজ ইতিহাসের সফলতম, সর্বকালের সেরা ফুটবলার।
তা হলে ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপে মেসি কেন আবার মাঠে নামলেন? এই প্রশ্নটার উত্তর লুকিয়ে আছে ফুটবল খেলাটার প্রতি তার সীমাহীন ভালোবাসায়। তিনি তো এখন স্রেফ আনন্দের জন্য খেলেন, খেলেন আর্জেন্টিনার ওই জার্সিটার টানে। কিন্তু আমাদের জন্য, এই সাধারণ দর্শকদের জন্য এবারের বিশ্বকাপটা এক পরম প্রাপ্তির পাশাপাশি এক মহাকষ্টের অধ্যায়। প্রতিটি ম্যাচে যখন মেসি বল পায়ে দৌঁড়াবেন, আমরা প্রতিটা সেকেন্ডকে পলকহীন চোখে ধরে রাখতে চাইব।
এই টুর্নামেন্টের পর আর কখনো বিশ্বকাপের মঞ্চে ১০ নম্বর জার্সি পরা জাদুকরকে দেখা যাবে না। মাঝমাঠ থেকে বল কেড়ে নিয়ে প্রতিপক্ষের তিন-চারজন ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে নিখুঁত শটে বল জালে জড়ানো কিংবা শেষ মুহূর্তে কোনো জাদুকরী পাসে ফরোয়ার্ডদের দিয়ে গোল করানো এই দৃশ্যগুলো আর কদিন পরেই কেবল ইউটিউবের ভিডিওতে কিংবা স্মৃতির অ্যালবামে বন্দি হয়ে যাবে।
২০২৬ বিশ্বকাপ তাই ফুটবলের এক সোনালি যুগের অবসান, এক মহাকাব্যের শেষ লাইনের শেষ শব্দ। বিদায়ের এই অন্তিমলগ্নে দাঁড়িয়ে পুরো পৃথিবী আজ তার দিকে চেয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে, চোখ ছলছল করছে কোটি ভক্তের চোখ। উচ্চারিত হবে বিদায়ের সুর ধন্যবাদ লিও মেসি।
সময়ের আলো/আআ