তেইশ বছর আগে যে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল, সেই ডারউইনেই এবার বদলে গেল গল্পের শেষটা। একসময় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিন দিন টিকে থাকাও ছিল বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এবার সেই একই অস্ট্রেলিয়াকে তাদের নিজেদের মাটিতে ৯ উইকেটে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজেদের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় লিখল টাইগাররা।
ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে নাজমুল হোসেন শান্তর দল শুধু একটি টেস্ট জেতেনি, বদলে দিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ক্রিকেটের গল্পটাই। যে দলকে একসময় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লড়াই করার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন শুনতে হতো, সেই বাংলাদেশই এবার স্বাগতিকদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে অবিশ্বাস্য এক জয়। জয়ের সমীকরণ অবশ্য চতুর্থ দিন শুরুর আগেই হেলে পড়েছিল বাংলাদেশের পক্ষে। অস্ট্রেলিয়ার সামনে ছিল ম্যাচ বাঁচানোর কঠিন পরীক্ষা।
এমনকি একপর্যায়ে ইনিংস ব্যবধানে হারের শঙ্কাতেও পড়ে গিয়েছিল স্বাগতিকরা। তবে ক্যামেরন গ্রিনের দুর্দান্ত সেঞ্চুরি এবং অ্যালেক্স ক্যারির প্রতিরোধে সেই লজ্জা থেকে বেঁচে যায় অস্ট্রেলিয়া। কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য বদলানোর মতো কিছু করতে পারেনি তারা।
চতুর্থ দিনের শুরুতে ৪ উইকেটে ১৬১ রান নিয়ে ব্যাট করতে নেমেছিল অস্ট্রেলিয়া। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বোলারদের সামনে ২৮৪ রানেই থেমে যায় তাদের দ্বিতীয় ইনিংস। ফলে বাংলাদেশের সামনে জয়ের লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। এই ছোট্ট লক্ষ্য তাড়াতেও অবশ্য নাটকের অভাব ছিল না।
দিনের দ্বিতীয় ওভারেই জশ হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে ফিরে যান তানজিদ হাসান। কিন্তু তাতে বাংলাদেশের জয় নিয়ে কোনো শঙ্কা তৈরি হয়নি। ক্রিজে এসে মুমিনুল হক ও শাদমান ইসলাম ঠান্ডা মাথায় বাকি কাজটুকু শেষ করেন। দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই মুমিনুলের ব্যাট থেকে আসা বাউন্ডারিতে নিশ্চিত হয় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়।
ম্যাচ জেতানো শট খেলার পর মুমিনুলের উদযাপন ছিল একেবারেই সংযত। একটি ছোট্ট মুষ্টিবদ্ধ উদযাপন। যেন জানতেন, তিনি শুধু একটি ম্যাচের শেষ রানটি করেননি, বাংলাদেশের ক্রিকেটের দুই যুগ ইতিহাসে লিখেছেন অবিস্মরণীয় এক অধ্যায়ের শেষ লাইন। এই জয় কতটা বড়, সেটি বোঝা যায় দুই দলের সাম্প্রতিক রেকর্ড দেখলেই। অস্ট্রেলিয়া তাদের আগের ২৩ টেস্টের ১৮টিতেই জিতেছিল। টানা দুই বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালেও খেলেছে তারা।
বিপরীতে এশিয়ার বাইরে নিজেদের আগের ২৬ টেস্টের ২২টিতেই হেরেছিল বাংলাদেশ। অস্ট্রেলিয়া সফরের আগে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে ৫৪ রানে অল-আউট হয়ে ইনিংস ব্যবধানেও হেরেছিল তারা।
কিন্তু ডারউইনে কোনো পরিসংখ্যানই কাজে লাগেনি অস্ট্রেলিয়ার। বরং প্রথম দিন থেকেই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় বাংলাদেশ। সেই নিয়ন্ত্রণের প্রথম বড় কারিগর হাসান মাহমুদ। প্রথম ইনিংসে ক্যারিয়ারসেরা ৬ উইকেট নিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেন বাংলাদেশের এই পেসার। ম্যাচে তার শিকার ৯ উইকেট। গত ১৫ বছরে জাসপ্রিত বুমরাহ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনো সফরকারী বোলারের এটিই সেরা ম্যাচ পরিসংখ্যান।
বল হাতে হাসানের আগুনের পর ব্যাট হাতে বাংলাদেশকে পথ দেখান তানজিদ হাসান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যেকোনো ফরম্যাটে বাংলাদেশের প্রথম সেঞ্চুরিয়ান হয়ে ইতিহাস গড়েন এই বাঁহাতি ওপেনার। তার দুর্দান্ত শতক বাংলাদেশকে এনে দেয় বড় লিড, যা শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়। এরপর বাংলাদেশের জয়ের গল্পে সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি হয়ে ওঠেন মেহেদী হাসান মিরাজ।
প্রথম ইনিংসে ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলার পর দ্বিতীয় ইনিংসে বল হাতে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংয়ের ভিত নাড়িয়ে দেন তিনি। নেন পাঁচ উইকেট। তার শিকারদের মধ্যে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম সেরা ব্যাটার স্টিভেন স্মিথও। মিচেল স্টার্কের বুটের দাগকে কাজে লাগিয়ে নিজের অফস্পিনে নিখুঁত জায়গায় আঘাত করেছেন মিরাজ। একের পর এক ডানহাতি ব্যাটারকে বিভ্রান্ত করে শেষ পর্যন্ত তুলে নেন ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি ফাইফার।
অস্ট্রেলিয়ার শেষ আশার নাম ছিলেন ক্যামেরন গ্রিন। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ক্রিজে থেকে দলের পতন ঠেকানোর চেষ্টা করেন তিনি। মাত্র চারটি বাউন্ডারি দিয়ে ধৈর্যের অসাধারণ পরীক্ষা দিয়ে নিজের ঘরের মাঠে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিও তুলে নেন গ্রিন। তার প্রতিরোধে অস্ট্রেলিয়া ইনিংস ব্যবধানে পরাজয় এড়ায় ঠিকই, কিন্তু ম্যাচের ফল বদলাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত হাসান মাহমুদের বলে গ্রিনের স্টাম্প ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন নিভে যায় অস্ট্রেলিয়ার শেষ আশাটুকুও।
এই জয় তাই নিছক একটি টেস্ট জয় নয়; এটি ২৩ বছরের অপেক্ষার অবসান। এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের দীর্ঘ পথচলা, ব্যর্থতা, হতাশা আর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পের এক অবিশ্বাস্য পরিণতি। ২০১৭ সালে ঢাকায় অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটি ছিল ঐতিহাসিক জয়। কিন্তু ডারউইনের জয় তার চেয়েও বড়, আরও গভীর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এবার কোনো ঘরের মাঠ ছিল না, ছিল না উপমহাদেশের পরিচিত স্পিনসহায়ক কন্ডিশন। ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটি, অস্ট্রেলিয়ার দর্শক, অস্ট্রেলিয়ার শক্তিশালী দল এবং তাদের বিশ্বসেরা পেস আক্রমণ। যার মধ্যে তিন পেসারের ঝুলিতেই ছিল ৩০০টির বেশি করে টেস্ট উইকেট।
সেই পরিবেশেই বাংলাদেশ দেখিয়ে দিল, তারা এখন আর শুধু লড়াই করার দল নয়। তারা ম্যাচ জিততে পারে। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতেও জিততে পারে। দুই বছর আগে গ্যাবায় শামার জোসেফের নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবিশ্বাস্য জয় অস্ট্রেলিয়াকে যেমন স্তব্ধ করেছিল, ডারউইনের এই জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটে তেমনই এক রূপকথার জন্ম দিল।
বরং বাংলাদেশের জন্য এর মাহাত্ম্য আরও বেশি। কারণ, এটি শুধু একটি জয় নয়, এটি আত্মপরিচয়েরও। হাসান মাহমুদের আগুনঝরা পেস, তানজিদ হাসানের ঐতিহাসিক ব্যাটিং, মিরাজের ব্যাটে-বলের ধ্রুপদী লড়াই, মুমিনুল-শাদমানের ঠান্ডা মাথার সমাপ্তি এবং নাজমুল হোসেন শান্তর নিখুঁত নেতৃত্ব- সবকিছু মিলিয়ে ডারউইনে বাংলাদেশ লিখেছে এমন এক গল্প, যার প্রতিটি অধ্যায় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন।
তেইশ বছর আগে অস্ট্রেলিয়া সফর ছিল বাংলাদেশের শেখার মঞ্চ। ২৩ বছর পর সেই অস্ট্রেলিয়াতে ফিরেই বাংলাদেশ লিখল ইতিহাস। আর ইতিহাসটা এমনই, যেখানে অস্ট্রেলিয়া নয়, শেষ হাসিটা হাসল বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট ম্যাচ জয়ের ঐতিহাসিক সাফল্যে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার ডারউইনে সিরিজের প্রথম টেস্টে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে এক ঐতিহাসিক জয় পায় বাংলাদেশ। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নেমেই স্মরণীয় এই সাফল্য অর্জন করে টাইগাররা।
জয় নিশ্চিত হওয়ার পর নিজের কর্মব্যস্ততার ফাঁকেই তৎক্ষণাৎ বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটারদের সঙ্গে ভিডিও কলে যুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় নাজমুল হোসেন শান্ত, হাসান মাহমুদ ও তানজিদ হাসানের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল ক্রিকেটারদের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। বাংলাদেশের মানুষের পক্ষ থেকেও দলের খেলোয়াড়দের শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তানজিদ হাসানের সঙ্গে কথা বলার সময় বিসিবি সভাপতি তামিম ইকবাল উল্লেখ করে বলেন, ‘তানজিদ হাসান বগুড়ার ছেলে, সেঞ্চুরি করেছে।’ সঙ্গে সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তাকে সংশোধন করে বলেন, ‘বগুড়ার না, ও বাংলাদেশের ছেলে। সে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করছে, বগুড়াকে না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে তাদেরই মাটিতে এমন জয় দেশের ক্রিকেটের জন্য অত্যন্ত গৌরবের। খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় মনোবল, দক্ষতা ও দলগত প্রচেষ্টার ফলেই এই সাফল্য এসেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে পরের টেস্টেও ভালো খেলে সিরিজ জয়ের সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার প্রত্যাশা জানান প্রধানমন্ত্রী।
এদিকে বাংলাদেশ দলের ঐতিহাসিক জয়ে অভিনন্দন জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকও। তিনি খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে শুভেচ্ছা জানান। অভিনন্দন বার্তায় প্রতিমন্ত্রী বলেন, অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে মাত্র চার দিনে ৯ উইকেটের এই জয় বাংলাদেশ ক্রিকেটে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর নেতৃত্বে ব্যাট ও বলে দলের আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্সের প্রশংসা করে তিনি বলেন, পাঁচ দিনের লড়াইয়ের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামলেও বাংলাদেশ ১১তম সেশনেই জয় নিশ্চিত করেছে। এই জয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করবে উল্লেখ করে ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাফল্যের ধারা আরও এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিরপুরে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে তাদের হারিয়ে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের কীর্তি গড়ল টাইগাররা।
সময়ের আলো/এসএকে