বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদী থেকে বেপরোয়া বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের কবলে পড়েছে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। বর্ষার প্রাক্কালে এ ভাঙন আরও তীব্ররূপ ধারণ করেছে। অথচ বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন-২০১০ এ স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, বালু বা মাটি উত্তোলন বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে ড্রেজিংয়ের কারণে যদি কোনো নদীর তীর ভাঙনের শিকার হয় এমন নদী থেকে বালু উত্তোলন করা যাবে না। নদীর ভূ-প্রাকৃতিক পরিবেশ, প্রতিবেশ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য, জলজ ও স্থলজ প্রাণী, ফসলি জমি বা উদ্ভিদ বিনষ্ট হয় বা হওয়ার আশঙ্কা থাকে এমন নদী থেকেও বালু উত্তোলন করা যাবে না।
এ প্রসঙ্গে বানারীপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বায়েজিদুর রহমান বলেন, বরিশাল জেলার মধ্যে শুধু বানারীপাড়া উপজেলার সন্ধ্যা নদীতে দুটি পয়েন্টে বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়েছে। উন্নয়নমূলক কাজে বালুর চাহিদার কথা তুলে ধরে ইউএনও আরও বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে বৈধ বালুমহাল ইজারা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসক ও বরিশাল জেলা বালুমহাল কমিটির সভাপতি মো. খায়রুল আলম সুমনের অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। এদিকে নদী ভাঙনকবলিত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী স্থানীয় সংসদ সদস্য সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টুর কাছে নদীভাঙন রোধে স্থায়ী, টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নদীভাঙনের কারণ হচ্ছে নদী দিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধ করতে হবে। জেলা প্রশাসন বালু উত্তোলনের জন্য বালুমহাল ইজারা দিয়ে থাকে। সে ব্যাপারে জেলা প্রশাসনকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা মেনে বালুমহাল ঘোষণা করতে হবে। তবে অনেক সময় নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইজারাদাররা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশে নদীর তীরসংলগ্ন এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করে। ফলে নদীর তীর সংরক্ষণ করা যায় না, আবার ভাঙন শুরু হয়। নদীশাসন ও নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধ না করা গেলে প্রকল্পগুলোর সুফল অনেকাংশে কমে যাবে। তাই যেকোনোভাবেই স্থানীয় প্রশাসনকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন রোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, উপজেলার সলিয়াবাকপুর ইউনিয়নের খেজুরবাড়ি, গোয়াইলবাড়ি ও খোদাবখশা, বাইশারী ইউনিয়নের উত্তরকুল, বাংলাবাজার, নাটুয়ারপাড়, শিয়ালকাঠী, উত্তর নাজিরপুর দান্ডয়াট ও ডুমুরিয়া, সৈয়দকাঠী ইউনিয়নের মসজিদবাড়ী, সাতবাড়িয়া, পূর্ব জিরারকাঠী, দাসেরহাট, দিদিহার ও নলশ্রী, সদর ইউনিয়নের জম্বুদ্বীপ, ব্রাহ্মণকাঠী ও কাজলাহার এবং চাখার ইউনিয়নের চাউলাবাঠী, চিরাপাড়া, কালিরবাজার, হক সাহেবের হাট প্রভৃতি এলাকায় ভয়াবহভাবে ভাঙছে সন্ধ্যা নদী। এসব গ্রাম মানচিত্রে থাকলেও বাস্তবে সিংহভাগ নদী গ্রাস করে ফেলেছে। ফলে ভিটেমাটি ফসলি জমি সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে পড়েছে শত শত পরিবার।
নদীভাঙনের কারণে ঝুঁকির মুখে বানারীপাড়ার শিয়ালকাঠী ফেরিঘাট, উত্তর নাজিরপুর জামে মসজিদ, মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, খোদাবখশা দাখিল মাদরাসা, কালির বাজার, জম্বুদ্বীপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মিরেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পুরোনো ভবনসহ বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। এর মধ্যে মসজিদবাড়ী স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দান্ডয়াট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নাটুয়ারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদরাসা, উত্তরকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নলশ্রী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জাঙ্গালীয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও খোদাবখশা দাখিল মাদরাসাসহ আরও বেশ কয়েকটি স্কুল-মাদরাসা চার থেকে পাঁচবার স্থানান্তর করতে হয়েছে। এমন পরিবারও রয়েছে যারা নদীভাঙনের কারণে ৪-৫ বার ঘর স্থানান্তর করেও ফের নদীভাঙনের মুখে পড়েছে।
বানারীপাড়ার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী উজিরপুর উপজেলার বহু এলাকাও পড়েছে সন্ধ্যা নদীর তীব্র ভাঙনের কবলে। উজিরপুরের শিকারপুর, দাসেরহাট, লস্করপুর, চতলবাড়ী ও ডাবেরকুলসহ বহু এলাকায় নদীভাঙনে সর্বস্ব হারিয়েছে শত শত মানুষ। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় জনসাধারণের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ সত্ত্বেও বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদীতে ৬টি ও অন্তর্বতী সরকারের আমলে ৩টি পয়েন্টের বালুমহাল ইজারা দেওয়া হয়। এবারও বরিশাল জেলা প্রশাসন ভাঙনকবলিত নদীতে বালুমহাল ইজারা দিয়েছে। ভাঙনপ্রবণ সন্ধ্যা নদী বানারীপাড়া উপজেলার খেজুরবাড়ি ও মসজিদবাড়ীর পয়েন্টে যথাক্রমে দুই একর ও সাত একর নদীর জায়গা বালুমহাল ঘোষণা করে ইজারা দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, নদীতে ব্লক দিয়ে ও জিও ব্যাগ ফেলে নদীভাঙনের হাত থেকে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোকে রক্ষা করা, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন তা না করে উল্টো বালুমহাল ইজারা দিয়েছে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী জনসাধারণের মাঝে অসন্তোষ ও ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। এর আগে গত বছর এ নদীতে বালু উত্তোলনের প্রতিবাদে বানারীপাড়ায় বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিল ও মানববন্ধন করে সর্বস্তরের মানুষ।
নদীভাঙন রোধে বিভিন্ন সময় বালুমহাল ইজারা বন্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশনও দাখিল করা হয়। উপজেলার খেজুরবাড়ি ও মসজিদবাড়ীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, স্থানীয় জনমতকে উপেক্ষা করে নদীভাঙনকবলিত এলাকায় বালু উত্তোলন করা হলে মানুষের দুর্ভোগ ও বাস্তুহারা হওয়ার ঝুঁকি চরমভাবে বৃদ্ধি পাবে।
নদীভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা বাংলা একাডেমির পুরস্কাপ্রাপ্ত অনুবাদক ও সাবেক রাজস্ব বোর্ডের সদস্য আলী আহমদ বলেন, ভাঙনকবলিত নদীতে স্থানীয় প্রশাসন কীভাবে বালুমহাল ঘোষণা করে! আমি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ভাঙনকবলিত এই নদীতে বালু তোলার কারণে আমার এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, বাড়িঘর বারবার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
সময়ের আলো/আআ