প্রকৃতি কখনো জীবন ও জীবিকার আশীর্বাদ, আবার কখনো ধ্বংসের নির্মম বার্তা। কৃষিনির্ভর রংপুর অঞ্চলের ইতিহাসে প্রকৃতির এই দুই রূপেরই অসংখ্য সাক্ষ্য রয়েছে। কখনো অনাবৃষ্টি, কখনো বন্যা, কখনো ভূমিকম্প কিংবা দুর্ভিক্ষ-প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট নানা সংকটে বারবার বিপর্যস্ত হয়েছে এ অঞ্চলের জনজীবন ও কৃষিব্যবস্থা। ইতিহাসের পাতা উল্টালে গত প্রায় আড়াইশ বছরে উত্তরাঞ্চলজুড়ে ঘটে যাওয়া একের পর এক দুর্যোগের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
পরিবেশবাদী সংগঠন বাপার রংপুর জেলা সদস্য সচিব রশিদুস সুলতান বাবলু, প্রবীণ সাংবাদিক নজরুল মৃধা, গবেষক ও লেখকবৃন্দ এবং প্রবীণ আইনজীবী আব্দুর রশিদ চৌধুরী মনে করেন, ঋতুচক্রের অস্বাভাবিক পরিবর্তন, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অসময়ের বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি এবং খরার প্রবণতা উত্তরাঞ্চলের কৃষিকে নতুন ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
তাদের মতে, অতীতের দুর্ভিক্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ইতিহাস বর্তমান প্রজন্মের জন্য সতর্কবার্তা হয়ে আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পরিকল্পনা ও অভিযোজনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চল আবারও বড় ধরনের কৃষি ও পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি হতে পারে।
রংপুর গেজেটিয়ারসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৭৬৯-৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ছিল এ অঞ্চলের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয়। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শোষণ, খাদ্য সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার ফলে সৃষ্ট ওই দুর্ভিক্ষে তৎকালীন ভারতবর্ষে প্রায় দেড় কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। এর প্রভাব থেকে রেহাই পায়নি রংপুরও।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৭৬৮ সালে অনাবৃষ্টির কারণে জেলার অধিকাংশ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। পরের বছর আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী খরায় কৃষিজমি শুকিয়ে পড়ে, খাদ্য উৎপাদন ভয়াবহভাবে কমে যায় এবং চালের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পায়। ফলে অনাহারে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
এরপর ১৭৮৭-৮৮ সালেও রংপুরে দেখা দেয় আরেকটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। অতিবৃষ্টি, বন্যা এবং কৃষি ঋণের চাপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। খাদ্যশস্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
১৮৭৪ সালেও অনাবৃষ্টির কারণে রংপুরে খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। সে বছর কৃষকরা স্বাভাবিক উৎপাদনের মাত্র এক-সপ্তমাংশ ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য এবং কৃষি ঋণ সহায়তা কর্মসূচি চালু করে। আগস্টের শেষ দিকে অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটে।
এ ছাড়া ১৮৫৭-৫৮, ১৮৬২-৬৩, ১৮৬৬-৬৭ এবং ১৯০৮-০৯ সালেও অনাবৃষ্টির কারণে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটে। ১৮৬৬ সালের দুর্ভিক্ষ সরাসরি রংপুরে আঘাত না হানলেও অন্যান্য অঞ্চলে খাদ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় এখানকার বাজারেও খাদ্যদ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
রংপুরের ইতিহাসে ১৮৯৭ সালের ১২ জুনের ভূমিকম্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বাংলাদেশ, আসাম ও বিহারজুড়ে অনুভূত ওই ভূমিকম্প কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়েছিল। এতে জেলার বিভিন্ন স্থানে ভূমিতে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয় এবং মাটি ফুঁড়ে বালু ও পানি বের হয়ে আসে। ভূমিকম্পের ফলে বহু আবাদি জমি বালুতে ঢেকে কৃষিকাজের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি অসংখ্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, সে সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল ৩০ লাখ টাকারও বেশি, যা তৎকালীন সময়ে ছিল বিশাল অঙ্ক।
দুর্যোগটির প্রভাবে জেলার কয়েকটি নদী ও খালের গতিপথ এবং গভীরতাতেও পরিবর্তন আসে। স্থানীয় ইতিহাসবিদদের মতে, রংপুর শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বর্তমান শ্যামাসুন্দরী খালের রূপান্তরের পেছনেও ওই ভূমিকম্পের প্রভাব রয়েছে।
বন্যাও রংপুর অঞ্চলের মানুষের জন্য বারবার দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। ১৮৭০ ও ১৮৭৫ সালের বড় বন্যার পাশাপাশি স্বাধীনতার পর ১৯৭৪, ১৯৮৭ ও ১৯৮৮ সালের বন্যা কৃষি ও জনজীবনে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষও উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য ছিল এক ভয়াবহ অধ্যায়। চাল আমদানি বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ায় তৎকালীন বাংলার অন্যান্য অঞ্চলের মতো রংপুরেও দেখা দেয় তীব্র খাদ্য সংকট। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার লঙ্গরখানা চালুর মতো উদ্যোগ গ্রহণ করে।
তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে রংপুরের কৃষি অর্থনীতি। মাত্র তিন দশক আগেও ‘মঙ্গাপীড়িত’ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চল আজ কৃষি উৎপাদনে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। আশ্বিন ও কার্তিক মাসে কাজের অভাবে হাজারো মানুষের মানবেতর জীবনযাপনের সেই চিত্র এখন অনেকটাই অতীত। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং বহুমুখী ফসল চাষের ফলে অনেক জমিতে এখন বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদন হচ্ছে।
সময়ের আলো/আআ