আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নতুন কোনো মেগা প্রকল্প হাতে নেয়নি সরকার। বরং চলমান মেগা প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের কাজ শেষ করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ খাত এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মেগা প্রকল্পেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন প্রস্তাবিত বাজেটে অনুমোদিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে কয়েকটি প্রকল্পে (এডিপি) বড় আকারের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী অর্থবছরের এডিপিতে ১৫টি বৃহৎ প্রকল্পের জন্য মোট ৫৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা এডিপির মোট বরাদ্দের প্রায় ১৮ শতাংশ। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে। বরাদ্দের পরিমাণ ১৫ হাজার ৪৯৯ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ ছিল ১০ হাজার ১১ কোটি টাকা। গত বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন কাজ ৬৮ দশমিক ২৮ শতাংশ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে সরকারের। প্রকল্পাটর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে রাশিয়া।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান এক গণমাধ্যমে বলেন, ‘বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করে সেবা সৃষ্টির পদক্ষেপ ভালো উদ্যোগ। তবে প্রকল্পের ব্যয় সাশ্রয়ী করা, গুণমান ও গোটা প্রক্রিয়ায় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। কেননা অতীতে প্রকল্প নিয়ে অনেক অনিয়ম দেখা গেছে।’
আসন্ন নতুন অর্থবছরে এডিপিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে এমআরটি-১ প্রকল্পে, যা দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প। এ প্রকল্পে চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বরাদ্দ ছিল মাত্র ৮০১ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে ইতোমধ্যে ডিপোর ভূমি উন্নয়ন কাজ শেষ হয়েছে। বিমানবন্দর পর্যন্ত ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের কাজ শেষ হয়েছে। ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া এ প্রকল্পটি ২০৩০ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। গত অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে খরচের পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটি জাইকার কারিগরি ও ঋণ সহায়তায় নির্মিত হওয়ার কথা। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৩ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যার মধ্যে জাইকার ঋণ দেওয়ার কথা ৪০ হাজার কোটি টাকা। মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)।
আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের। আগামী এডিপিতে তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে এই প্রকল্প। প্রকল্পটিতে আগামী অর্থবছরের জন্য ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের ১ হাজার ৭৮ কোটি টাকার বরাদ্দের চার গুণেরও বেশি। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫৬ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা। গত বছরের জুন মাস পর্যন্ত প্রকল্পে নির্মাণকাজে ব্যয় করা হয়েছে ৫০ হাজার ২৮৫ কোটি টাকা। প্রকল্পটিতে কারিগরি ও ঋণ সহায়তা দিচ্ছে জাপান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা।
ঢাকার পশ্চিম অংশের সঙ্গে পূর্ব অংশের পরিবহন যোগাযোগ সহজ করার উদ্দেশ্যে হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত রুট নিয়ে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্পটি আগামী এডিপিতে চতুর্থ সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে। প্রকল্পটির বরাদ্দ ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা করা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে যা ছিল ৮৬৩ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে হেমায়েতপুরে অবস্থিত ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র চূড়ান্ত করা ও প্রকল্পের জন্য সংশোধিত ডিপিপি তৈরি এবং তা অনুমোদনের ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, উত্তরা থেকে মতিঝিলের দেশের প্রথম মেট্রোরেল ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ নামে প্রকল্পটির কাজ এখনও শেষ হয়নি। মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ চলছে। আগামী অর্থবছরে প্রকল্পটিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে যা ছিল ১ হাজার ২৩ কোটি টাকা। বাড়তি বরাদ্দ দিয়ে কমলাপুর অংশ পর্যন্ত বাণিজ্যিক কার্যক্রমে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ প্রকল্পে ৭৫৫ কোটি টাকা ব্যয় কমানো হয়। এতে প্রকল্পের সম্ভাব্য মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৭১৮ কোটি টাকা। গত বছরের জুন পর্যন্ত ব্যয় করা হয়েছে ২৫ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। জাইকা এ প্রকল্পে কারিগরি ও ঋণ সহায়তা দিচ্ছে। জাইকার ঋণের পরিমাণ ২০ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা।
/মহু