‘আজতেকা স্টেডিয়ামের আবহ সম্পূর্ণ আলাদা, এর ভেতরে পা না রাখলে, এর রোমাঞ্চ নিজের হৃদয়ে অনুভব না করলে একে বোঝা অসম্ভব। এটি সত্যিই অনন্য,’— এস্তাদিও আজতেকা নিয়ে এভাবেই নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেছিলেন ফুটবল সম্রাট পেলে। মেক্সিকোর রাজধানী মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক স্টেডিয়ামেই ১৯৭০ সালে নিজের ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা মুহূর্তটি উপহার দিয়েছিলেন ব্রাজিলিয়ান এই কিংবদন্তি; উঁচিয়ে ধরেছিলেন তার ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি।
চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে ফুটবলবিশ্ব এক নতুন ইতিহাসের সাক্ষী হতে যাচ্ছে। প্রায় দুই বছর ধরে ব্যাপক সংস্কার কাজ শেষে মেক্সিকো সিটির এই ৮৩ হাজার আসন বিশিষ্ট ফুটবলস্বর্গ আবারও মেতে উঠছে ফুটবলের উন্মাদনায়। আজকের উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপে (১৯৭০, ১৯৮৬ এবং ২০২৬) ম্যাচ আয়োজনের এক অনন্য কীর্তি গড়তে যাচ্ছে এই ভেন্যু।
‘কলোসাস অব সান্তা উরসুলা’ নামে পরিচিত এই স্টেডিয়ামের নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৯৬১ সালে। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ১৯৬৬ সালে মেক্সিকোর ক্লাব আমেরিকা ও ইতালির ক্লাব তোরিনোর মধ্যকার উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্য দিয়ে উন্মোচন হয় এর দুয়ার, যেখানে উপস্থিত ছিলেন ১ লক্ষ ৭ হাজারেরও বেশি দর্শক। এরপর ১৯৬৮ সালের মেক্সিকো সিটি অলিম্পিকের ফুটবলের ফাইনালসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় এই মাঠে।
১৯৭০ সালে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে প্রথম দেশ হিসেবে মেক্সিকো যখন বিশ্বকাপ আয়োজন করে, তখন ফুটবল বিশ্বের মূল আকর্ষণ ছিল এই আজতেকা স্টেডিয়াম। সেবার উদ্বোধনী ম্যাচসহ মোট ১০টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল এই ভেন্যুতে। এই মাঠেই ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে স্বীকৃত ইতালি বনাম পশ্চিম জার্মানির সেই ক্লাসিক সেমিফাইনালটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যেখানে অতিরিক্ত সময়ে ৪-৩ ব্যবধানে জিতেছিল ইতালি। তবে ফাইনালে ইতালির স্বপ্ন ভেঙে ৪-১ ব্যবধানে ট্রফি জিতে নেয় পেলে-কার্লোস আলবার্তোদের জাদুকরী ব্রাজিল।
পেলের ট্রফি জয়ের ১৬ বছর পর, ১৯৮৬ সালে আবারও মেক্সিকোতে ফেরে বিশ্বকাপ। আর সেবার আজতেকা স্টেডিয়াম উপহার দেয় ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও কালজয়ী দুটি মুহূর্ত। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচের ৫৫ মিনিটে ডিয়েগো ম্যারাডোনা ও ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটন একটি হাই বল দখলের জন্য লাফিয়ে ওঠেন। শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে ম্যারাডোনা তার বা হাত দিয়ে বলটি জালে ঠেলে দেন। রেফারির চোখ এড়িয়ে যাওয়ায় গোলটি বৈধতা পায়, যা পরবর্তীতে ম্যারাডোনার ভাষায় ‘হ্যান্ড অব গড’ বা ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে অমর হয়ে থাকে।
তবে সেই বিতর্কের রেশ কাটার আগেই মাত্র চার মিনিট পর একক নৈপুণ্যে মাঝমাঠ থেকে ইংল্যান্ডের ৫-৬ জন ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষককে কাটিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা একক গোলটি (গোল অব দ্য সেঞ্চুরি) করেন ম্যারাডোনা। পরবর্তীতে ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়ে এই মাঠেই বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরেন এই আর্জেন্টাইন মহানায়ক।
চলতি বিশ্বকাপে মেক্সিকো তাদের গ্রুপ পর্বের দুটি ম্যাচ এই মাঠেই খেলবে। তবে মেক্সিকোর ৮৩ হাজার উন্মাতাল সমর্থকের সামনে মাঠে নামা ছাড়াও প্রতিপক্ষ দলগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে এখানকার আবহাওয়া ও ভৌগোলিক অবস্থান।
ল্যাটিন আমেরিকার বৃহত্তম এই স্টেডিয়ামটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৭ হাজার ২০০ ফুট (২,২০০ মিটার) উঁচুতে অবস্থিত। উচ্চতা বেশি হওয়ায় এখানকার বাতাস বেশ পাতলা, যা ফুটবলারদের স্ট্যামিনা ও কার্যক্ষমতার ওপর বড় প্রভাব ফেলে। ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের মতে, এত উঁচুতে খেলার কারণে খেলোয়াড়রা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন, হৃদস্পন্দন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায় এবং আধুনিক ফুটবলের উচ্চ-তীব্রতার গতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে দলগুলোকে সাধারণত দুই সপ্তাহ আগে এসে মানিয়ে নেওয়ার অথবা ম্যাচের ঠিক আগমুহূর্তে ফ্লাই করে এসে সরাসরি মাঠে নামার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বিশ্বকাপকে সামনে রেখে গত দুই বছর ধরে বন্ধ ছিল স্টেডিয়ামটি। অবশেষে নতুন আসন, আধুনিক লকার রুম, উন্নত ফ্লাডলাইট এবং স্থানীয় হুইপুলকো পরিবহন নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হওয়া নতুন পথচারী সেতুসহ সম্পূর্ণ আধুনিক রূপ নিয়ে গত মার্চে মেক্সিকো ও পর্তুগালের একটি প্রীতি ম্যাচের মাধ্যমে এটি পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়। এবারের মহোৎসবে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং আজকের মেক্সিকো বনাম দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ম্যাচসহ মোট ৫টি হাইভোল্টেজ ম্যাচের আতিথ্য দেবে এই ঐতিহাসিক ফুটবল মঞ্চ।