ফুটবল মাঠে রেফারির সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ভিএআরের যুগে কিছু সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুযোগ থাকলেও শেষ কথা বলেন রেফারিই। আর সেই রেফারি যদি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই তিনটি লাল কার্ড দেখান, তাহলে তাকে ঘিরে আলোচনা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর উদ্বোধনী ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার লড়াই শেষে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে এসেছেন ব্রাজিলের রেফারি উইলটন সাম্পাইও। এস্তাদিও আজতেকায় অনুষ্ঠিত ম্যাচে তিনি তিনটি লাল কার্ড দেখিয়ে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে নতুন এক রেকর্ডের অংশ হয়েছেন।
স্বাগতিক মেক্সিকো ২-০ গোলের জয় দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করলেও ম্যাচ শেষে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রেফারিং এবং শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড।
৪৪ বছর বয়সী উইলটন সাম্পাইও ব্রাজিলের অন্যতম অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক রেফারি। ২০১৩ সাল থেকে ফিফার তালিকাভুক্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে ভিএআর কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার পর ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে মাঠের প্রধান রেফারির দায়িত্ব পান।
বিশ্বকাপ ছাড়াও কোপা লিবার্তাদোরেস, কোপা আমেরিকা এবং আন্তর্জাতিক ফুটবলের বহু গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবলে তিনি যেমন শীর্ষ পর্যায়ের রেফারি হিসেবে পরিচিত, তেমনি বিতর্কিত কিছু সিদ্ধান্তের কারণেও একাধিকবার সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ফাউলে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে হ্যারি কেইনের একটি পেনাল্টির দাবি উপেক্ষা করায় ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। একই বিশ্বকাপে পোল্যান্ড ও সৌদি আরবের ম্যাচেও ভিএআর দেখে পেনাল্টি দেওয়ার সিদ্ধান্ত এবং একটি ঘটনায় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড না দেখানো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে এসব বিতর্কের পরও ফিফা তার ওপর আস্থা রেখেছে। সেই আস্থার প্রতিফলনই দেখা গেছে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে।
মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে সাম্পাইওর সঙ্গে সহকারী রেফারি হিসেবে ছিলেন ব্রাজিলের ব্রুনো পিরেস ও ব্রুনো বোসকিলিয়া। চতুর্থ কর্মকর্তা ছিলেন প্যারাগুয়ের হুয়ান গ্যাব্রিয়েল বেনিতেজ। ভিএআরের দায়িত্বে ছিলেন কলম্বিয়ার নিকোলাস গাইয়ো। সহকারী ভিএআর হিসেবে ছিলেন চিলির হুয়ান লারা এবং সাপোর্ট ভিএআরের দায়িত্ব পালন করেন ফ্রান্সের জেরোম ব্রিসার্ড।
ম্যাচের শুরু থেকেই কঠোর অবস্থানে ছিলেন সাম্পাইও। নবম মিনিটে হুলিয়ান কিনোনেসের গোলে এগিয়ে যায় মেক্সিকো। ভিএআরে সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনার পর গোলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
পুরো ম্যাচে দুটি হলুদ কার্ড দেখান তিনি। ১৬ মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার তেবোহো মোকোয়েনা এবং ২২ মিনিটে মেক্সিকোর ব্রায়ান গুতিয়েরেজ হলুদ কার্ড দেখেন।
তবে ম্যাচের আসল নাটক শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধে। ৪৯ মিনিটে দক্ষিণ আফ্রিকার স্পেফেহলো সিথোলে প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোলের সুযোগ নষ্ট করায় সরাসরি লাল কার্ড দেখেন। এরপর ৮৩ মিনিটে প্রতিপক্ষের মুখে আঘাত করার ঘটনায় ভিএআর পর্যালোচনার পর দক্ষিণ আফ্রিকার থেমবা জোয়ানেকেও লাল কার্ড দেখানো হয়।
অতিরিক্ত সময়ের প্রথম মিনিটে মেক্সিকোর অধিনায়ক সিজার মন্তেস প্রতিপক্ষের নিশ্চিত গোলের সুযোগ ঠেকাতে ফাউল করলে তাকেও সরাসরি লাল কার্ড দেখান সাম্পাইও। ফলে ম্যাচ শেষ হওয়ার আগেই দুই দল মিলে তিনটি লাল কার্ড দেখে।
এর মধ্য দিয়ে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সর্বোচ্চ লাল কার্ডের নতুন রেকর্ড গড়ে ওঠে। একই সঙ্গে ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের বিরল ঘটনাগুলোর একটি হয়ে যায়।
আরও একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, বিশ্বকাপে এর আগে যে ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল, সেখানেও ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ডেনমার্কের বিপক্ষে সেই ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার একজন এবং ডেনমার্কের দুইজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেছিলেন।
এই ম্যাচে বহিষ্কৃত তিন ফুটবলারই গ্রুপ ‘এ’-এর পরবর্তী ম্যাচে খেলতে পারবেন না। তবে মেক্সিকোর জয় কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার পরাজয়ের চেয়েও উদ্বোধনী রাতের আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিলেন একজনই, তিনি ব্রাজিলিয়ান রেফারি উইলটন সাম্পাইও।
আরবিএন