ফিফার বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় টুর্নামেন্টে বেসরকারি বিনিয়োগ আনার পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে বিতর্কের মধ্যে পদত্যাগ করেছেন সংস্থাটির সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) কর্দেইরো জানান, তিনি অবিলম্বে তার পদ ছেড়ে দিচ্ছেন। ফিফার নতুন উদ্যোগ ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই)-এ বেসরকারি বিনিয়োগ গ্রহণের পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি একমত নন বলে জানান। তার মতে, এই পরিকল্পনা “ফুটবলের জন্য একটি খারাপ চুক্তি”।
ফিফার প্রস্তাব অনুযায়ী, এফএফই-এর অধীনে প্রায় ২০০০ কোটি ডলার (২০ বিলিয়ন ডলার) মূল্যের একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হবে। এই প্রতিষ্ঠান বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন আয়োজন পরিচালনা করবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ মালিকানা বাইরের বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি করা হতে পারে।
এই উদ্যোগে অর্থায়নের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা রয়েছে জশুয়া কুশনারের, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ছোট ভাই।
এক বিবৃতিতে কর্দেইরো বলেন, “এই প্রস্তাবের সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না এবং আমি এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করছি।”
তিনি আরও বলেন, “এটি ফিফার সদস্য দেশগুলোর জন্য খারাপ চুক্তি, ফুটবলের জন্য খারাপ এবং দীর্ঘমেয়াদে খেলাটির ভবিষ্যতের জন্যও ক্ষতিকর।”
২০২৬ সালের যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপের জন্য গঠিত হোয়াইট হাউস টাস্কফোর্সে ফিফার প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেছেন কর্দেইরো।
সাবেক ব্যাংকার এবং যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনের সাবেক সহসভাপতি কর্দেইরোকে বিশ্ব ফুটবলের উন্নয়নে সহায়তা করার জন্য ২০২১ সালে ফিফায় নিয়োগ দেন ইনফান্তিনো।
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কর্দেইরো প্রশ্ন তোলেন, ফিফার হাতে যখন বিপুল পরিমাণ অর্থের রিজার্ভ রয়েছে এবং সংস্থাটির কোনো ঋণ নেই, তখন কেন তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের অংশ বিক্রি করে ৪২০ কোটি ডলার (৪.২ বিলিয়ন ডলার) সংগ্রহ করতে হবে।
তার মতে, ফিফার বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা ব্যবহার করেই সদস্য দেশগুলোকে আরও সহায়তা দেওয়া সম্ভব।
এদিকে, ফিফা জানিয়েছে, কিছু ভুল তথ্য ছড়ানোর কারণে তাদের পরামর্শ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে। তবে ২১১টি সদস্য ফুটবল সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া হবে এবং তারা তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
তার পদত্যাগ এমন সময়ে এলো, যখন ফিফার ২১১টি সদস্য ফুটবল সংস্থাকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই বিতর্কিত প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ইনফান্তিনো ইতোমধ্যে সতর্ক করেছেন, প্রস্তাবটি গ্রহণ না করলে সদস্য সংস্থাগুলো "পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে" থাকবে।
২০২১ সালে ইনফান্তিনো কর্দেইরোকে ফিফার ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করার জন্য নিয়োগ দিয়েছিলেন।
কর্দেইরোর ভাষায়, কোনো শক্তিশালী যৌক্তিক কারণ ছাড়াই ফিফা ফুটবলের ভবিষ্যৎ বন্ধক রাখতে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ফিফার সভাপতি নিজেই ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ১৫০০ কোটি ডলার (১৫ বিলিয়ন ডলার) আয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। তাই সদস্য সংস্থাগুলোকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা ফিফার আগেই রয়েছে।
তার মতে, এমন পরিস্থিতিতে মাত্র ৪২০ কোটি ডলার তুলতে ফুটবলের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের স্থায়ী অংশীদারিত্ব বিক্রি করার কোনো যুক্তি নেই।
জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কর্দেইরোর দায়িত্ব ছিল ফুটবলের সব স্তরে খেলাটির বিকাশে নতুন কৌশলগত উদ্যোগ সম্পর্কে ফিফাকে পরামর্শ দেওয়া।
২০২১ সালে তাকে নিয়োগ দেওয়ার সময় ইনফান্তিনো বলেছিলেন, কার্লোসই আমাদের নিয়ন্ত্রক কাঠামো আধুনিকায়ন এবং পুরুষ, নারী ও যুব ফুটবলের উন্নয়নে সঠিক ব্যক্তি।
ব্যবসা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকিংয়ে কর্দেইরোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং এশিয়ায় বিভিন্ন সরকার ও বিশ্বের শীর্ষ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে পরামর্শ দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ফুটবল ফেডারেশনে যোগ দেওয়ার আগে তিনি গোল্ডম্যান স্যাকসের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন এবং হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন।
এদিকে এফএফই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিরোধিতা বাড়লেও সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ফিফা জানিয়েছে, ভুল সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের কারণে তাদের পরামর্শ প্রক্রিয়া কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। তবে তারা পরিকল্পনাটি ২১১টি জাতীয় ফুটবল সংস্থার সামনে উপস্থাপনের প্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে।
ফিফা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আমরা এই পরামর্শ প্রক্রিয়া চালিয়ে যাব, যাতে প্রতিটি সদস্য সংস্থা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নিজেদের ভোট দিতে পারে।
সময়ের আলো/ইউএমএইচ