বিশ্বকাপের বল মাঠে গড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন উন্মাদনা পৌঁছেছে সর্বোচ্চ চূড়ায়। সেই উন্মাদনার ছোঁয়া প্রতিবারের মতো লেগেছে ফুটবলপ্রেমী লাল-সবুজের দেশ বাংলাদেশেও। ছোট্ট স্কুলের গণ্ডি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত থেকে অজপাড়া গাঁয়ের চায়ের দোকান- সবখানেই সরগরম বিশ্বকাপকে ঘিরে চিরচেনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার আলোচনা।
বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে ফুটবলপ্রেমীরা গায়ে জড়াচ্ছেন প্রিয় দল কিংবা পছন্দের খেলোয়াড়ের জার্সি। অনেকে আবার নিজেদের নামও ছাপিয়ে নিচ্ছেন সেই জার্সিতে। ছোট-বড়, তরুণ-তরুণী- সব বয়সি মানুষই নিজেদের পছন্দের জার্সিতে মেলে ধরছেন ভালোবাসা ও উচ্ছ্বাস।
বিশ্বকাপ মৌসুমে জার্সির চাহিদা থাকে তুঙ্গে। ফলে দেশের বাজারও হয়ে ওঠে সরগরম। কয়েকশ কোটি টাকার এই মৌসুমি বাজারকে ঘিরে বাড়ে বিভিন্ন দেশের পতাকার চাহিদাও। পাড়া-মহল্লা থেকে শহরের অলিগলি ও বাসার ছাদে উড়তে দেখা যায় নানা দেশের পতাকা। কোথাও কোথাও প্রিয় দলের রঙে রঙিন হয়ে ওঠে বাড়ির দেয়াল। পাশাপাশি ফুটবল, ট্রফি, ব্যানারসহ খেলার বিভিন্ন সরঞ্জামের বিক্রিও বেড়ে যায়।
রাজধানীর গুলিস্তান টুইন মার্কেট, স্টেডিয়াম মার্কেট ও নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাথজুড়ে জার্সির দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায় ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড়। যেন আরেক ঈদ মৌসুম। বাংলাদেশে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সমর্থক বেশি হওয়ায় সবচেয়ে বেশি চাহিদা এই দুই দলের জার্সির। এ ছাড়া জার্মানি, ফ্রান্স, পর্তুগাল, কানাডা, এমনকি ইরান, সৌদি আরব ও মরক্কোর জার্সিরও ক্রেতা রয়েছে।
বাজারে থাকা অধিকাংশ জার্সিই চীন থেকে আমদানি করা। এ ছাড়া থাইল্যান্ডের জার্সিও পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে তৈরি জার্সিও রয়েছে বাজারজুড়ে। প্রিমিয়াম ‘প্লেয়ার এডিশন’ জার্সির দাম এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা। ‘ফ্যান এডিশন’ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে এক হাজার টাকায়, আর ‘বিডি কপি’ পাওয়া যাচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। মাঝারি মানের জার্সি মিলছে ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকায়, কম মানের জার্সি ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। শিশুদের জার্সির দাম ১২০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে ক্রেতাদের অভিযোগ, এবার জার্সির দাম তুলনামূলক বেশি।
গুলিস্তানের ফুটপাথ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম সময়ের আলোকে বলেন, ‘এখন কেনাবেচা অনেক বেড়েছে। এবার বাচ্চাদের জার্সিও সমানতালে বিক্রি হচ্ছে।’
টুইন মার্কেটের শান্ত স্পোর্টসের সেলসম্যান মিশাল জানান, প্রতিদিন প্রায় লাখ টাকার বেশি জার্সি বিক্রি হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় অনেক সময় পর্যাপ্ত জার্সি না থাকায় সব মাপের জার্সি সরবরাহ করা যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
আরও পড়ুন
জার্সি কিনতে আসা শোয়াইব বলেন, ‘দুজনের জন্যই আর্জেন্টিনার ফ্যান জার্সি কিনেছি। বিশ্বকাপের সময় একসঙ্গে এই জার্সি পরে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগবে। তবে দাম কিছুটা বেশি মনে হয়েছে।’
জাতীয় স্টেডিয়ামের বিপরীত পাশের ফুটপাথের পতাকা বিক্রেতা শামীম বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা। বেশিরভাগ ক্রেতাই জার্সির সঙ্গে মিলিয়ে একই দলের পতাকা কিনছেন।’ তিন ফুটের পতাকা ১০০ টাকা, পাঁচ ফুটের ২৫০ টাকা এবং ১০ ফুটের পতাকা ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঁচ ফুটের বাংলাদেশের পতাকা পাওয়া যাচ্ছে ১৫০ টাকায়।
এদিকে বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে জার্সির বৈশ্বিক বাজারের আকার দাঁড়াতে পারে ৮৩৯ কোটি মার্কিন ডলারে। তবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফিফার অফিসিয়াল জার্সি কিংবা অংশগ্রহণকারী কোনো দলের জার্সি উৎপাদনে এবার জায়গা করে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে বাংলাদেশের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকছে দর্শকদের জন্য তৈরি ফ্যান জার্সি ও টি-শার্টে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যমতে, বিশ্বকাপ উপলক্ষে ফুটবল ও ফিফার লোগোসংবলিত জার্সি, টি-শার্ট ও হুডি মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয়েছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার পিস পোশাক। প্রায় ৪৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা মূল্যের এসব পণ্য ১৮টি দেশে রফতানি করেছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩৩টি তৈরি পোশাক কারখানা। তবে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের অফিসিয়াল পোশাক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত ছিল বাংলাদেশ।
ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের আকাক্সিক্ষত সেই ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া আসরকে ঘিরে দেশের মানুষের উচ্ছ্বাসের যেন শেষ নেই। দিন শেষে বিশ্বকাপজয়ী দল শত শত কোটি টাকার প্রাইজমানি পেলেও ফুটবলপ্রেমীদের প্রাপ্তি নিখাদ আবেগ, মানসিক প্রশান্তি এবং বৈশ্বিক এক কমিউনিটির অংশ হয়ে ওঠার আনন্দÑ যার কোনো অর্থমূল্য হয় না।
এএডি/