আম পর্যটন : সিজন থাকতেই ঘুরে আসুন ৩ জেলা

বন্যা নাসরিন

ফিচার

“সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা পলায়ন-ভাবিলাম

2026-06-13T19:58:27+00:00
2026-06-13T19:58:27+00:00
 
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
ফিচার
আম পর্যটন : সিজন থাকতেই ঘুরে আসুন ৩ জেলা
বন্যা নাসরিন
প্রকাশ: শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ৭:৫৮ পিএম   (ভিজিট : ১৪)
আম এই ভূখণ্ডেরই নিজস্ব প্রকৃতির অংশ। গ্রাফিক : সময়ের আলো
“সেই মনে পড়ে, জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিকো ঘুম,
অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।
সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা পলায়ন-
ভাবিলাম হায়, আর কী কোথায় ফিরে পাব সে জীবন!”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ কবিতাই বলে দেয়, গ্রীষ্মকালীন ফল আমের সঙ্গে কী দারুণ স্মৃতিই না আছে তার। এমন মধুর স্মৃতি শুধু তার নয়, প্রায় সবারই রয়েছে। একসময় নিজের বাড়ি বা গ্রামের ভেতরই সাধারণত এমন স্মৃতি সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সময় বদলেছে, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছে। মানুষ এখন কেবল আমকে কেন্দ্র করেই ঘুরতে যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়, যেখানে এই রসালো ফলের উৎপাদন বেশি হয়। আমের টানে ঘুরতে যাওয়ার এ ব্যপারটিকেই বলে ‘আম পর্যটন’। 

বাংলাদেশের মাটিতে সবার প্রিয় সুস্বাদু এ ফলের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো। বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমারের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত অঞ্চলেই বুনো আমের প্রাচীন বিস্তার ছিল। অর্থাৎ, এটি এই ভূখণ্ডেরই নিজস্ব প্রকৃতির অংশ। 


বাংলার প্রাচীন সাহিত্য, লোকগাথা ও ধর্মীয় রচনায় আমের উল্লেখ পাওয়া যায়। সংস্কৃত সাহিত্য, বৌদ্ধ গ্রন্থ এবং মধ্যযুগীয় বাংলা কাব্যে আম্রকুঞ্জ, আম্রবীথি কিংবা আমবাগানের বর্ণনা বহুবার এসেছে। 

১৩শ শতাব্দী থেকে বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর কৃষিতে নানা পরিবর্তন আসে। আম তখন শুধু সাধারণ মানুষের খাদ্য নয়, অভিজাতদের রুচি ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবেও প্রতিষ্ঠা পায়। 

বাংলার আমের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় মুঘল আমলে। ভারতের বিহার রাজ্যের দ্বারভাঙায় লক্ষাধিক আমগাছ রোপণ করা হয়েছিল, যা সম্রাট আকবরের বিখ্যাত ‘লাখি বাগে’ নামে ইতিহাসে উল্লেখ আছে। তৎকালীন গৌড়, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিস্তীর্ণ আমবাগান গড়ে ওঠে। মুঘল আমলে আম শুধু খাদ্য ছিল না, ছিল কূটনৈতিক উপহারও। তারপর ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এই সুস্বাদু ফল আরও প্রসার লাভ করে।


এবার আসি ‘আম পর্যটন’ প্রসঙ্গে। ধরুন, মে-জুন মাসের শেষ বিকেল। চাঁপাইনবাবগঞ্জের জনপদ ধরে গাড়ি ছুটছে। রাস্তার দুপাশে যতদূর চোখ যায়, শুধু আমবাগান। কোথাও গাছে ঝুলছে সবুজ গোপালভোগ, কোথাও খিরসাপাতের হলুদ আভা, কোথাও আবার ল্যাংড়ার ভারে নুয়ে পড়েছে ডাল। বাতাসে মিশে আছে আমের গন্ধ। দূরে দেখা যাচ্ছে বাগানের ভেতরে বাঁশের মাচায় বসে পাহারা দিচ্ছেন কৃষক। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ছোট ছোট ট্রাক, ভ্যান ও পিকআপ। বাগান থেকে সদ্য নামানো আম উঠছে গাড়িতে। মনে হয় যেন পুরো অঞ্চল একসঙ্গে একটি ফলকে কেন্দ্র করে জেগে উঠেছে!

বাংলাদেশে ‘আমের রাজধানী’ নামে পরিচিত অঞ্চল হলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এ জেলার প্রায় ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়। অনেক পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে একই বাগান রয়েছে। কোনো গাছ হয়ত ১০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাম শুনলেই প্রথমে মনে আসে খিরসাপাত বা হিমসাগর আমের কথা। অনেকের মতে, এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে সুস্বাদু আম। আঁশহীন, মোলায়েম, ঘন মিষ্টি এবং অসাধারণ সুগন্ধি এই আম সাধারণত মে মাসের শেষ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহে বাজারে আসে। 

খিরসাপাতের পর আসে ল্যাংড়া। আমটির রস বেশি, সুবাস ভিন্ন, মুখে দিলে আলাদা ধরনের মিষ্টি অনুভূতি তৈরি হয়। জুনের দ্বিতীয়ার্ধে শুরু হয় ফজলির সময়। দেরিতে পাকে বলে মৌসুমের শেষ ভাগ পর্যন্ত ফজলি বাজারে থাকে। 

রাজশাহীর গল্প কিছুটা ভিন্ন। রাজশাহীকে অনেকে ‘আমের বিশ্ববিদ্যালয়’ বলেন। কারণ, এখানে শুধু আম উৎপাদনই হয় না, আমের জাত উন্নয়ন, গবেষণা, বিপণন এবং ব্র্যান্ডিংও হয়েছে সবচেয়ে বেশি। 



নওগাঁ তুলনামূলকভাবে নতুন। গত দুই দশকে এই জেলা আম উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে দ্রুত। বিশেষ করে আম্রপালি জাতের জন্য নওগাঁ এখন বিখ্যাত। আম্রপালি দেখতে তুলনামূলক ছোট, কিন্তু অত্যন্ত মিষ্টি এবং কম আঁশযুক্ত। এখানে আম চাষ অনেক বেশি পরিকল্পিত ও প্রযুক্তিনির্ভর।

সব মিলিয়ে প্রায় তিন মাস ধরে দেশে আমের উৎসব চলতে থাকে। এই সময়ে ভোরের আমহাট দেখা দারুণ পর্যটন অভিজ্ঞতা। রাত শেষ না হতেই বাগান থেকে আম নামতে শুরু করে। অন্ধকার ভেদ করে ট্রাক আসে। কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক- সবাই ব্যস্ত। সূর্য ওঠার আগেই হাজার হাজার মণ আমের বেচাকেনা সম্পন্ন হয়। 

অনেক বাগান মালিক এখন পর্যটকদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করছেন। কেউ বাগানে বসে আম খাওয়ার সুযোগ দেন, কেউ বাগান ঘুরিয়ে দেখান, কেউ আবার প্যাকেট করে সরাসরি বাগান থেকে আম কিনে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখেন। 

বিশ্বের অনেক দেশে ওয়াইন ট্যুরিজম আছে। ইতালিতে আঙুরখেত দেখতে যায় মানুষ, জাপানে ফলের বাগানে পর্যটকরা ফল তুলতে যায়, শ্রীলঙ্কায় চা বাগান পর্যটনের বড় আকর্ষণ। বাংলাদেশের জন্য আম পর্যটন তেমনই একটি সম্ভাবনা। গ্রীষ্মের দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো বাগানে গাছের ছায়ায় বসে সদ্য পাড়া খিরসাপাত খাওয়ার অভিজ্ঞতা, কিংবা জুনের সন্ধ্যায় রাজশাহীর পদ্মাপাড়ে বসে ল্যাংড়ার স্বাদ নেওয়া দারুণ এক অনুভূতির জন্ম দেয়।

ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আরও জনপ্রিয় হবে এই‘ম্যাঙ্গো ট্রেইল’। যেখানে ভ্রমণকারীরা মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ কিংবা নাটোর ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন জাতের আমের স্বাদ নেবেন, কৃষকের গল্প শুনবেন, বাগানে হেঁটে বেড়াবেন। সেইসঙ্গে দেখবেন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা আমের বাজারও।

কীভাবে যাবেন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী কিংবা নওগাঁ- ঢাকা বা দেশের যেকোনও স্থান থেকে সহজেই যেতে পারবেন এ ৩ টি জেলায়। প্রতিটি জেলার সঙ্গেই রেল ও সড়ক যোগাযোগ রয়েছে। এমনকি রাজশাহীতে ঢাকা থেকে উড়ালপথেও যেতে পারেন। 

কোথায় থাকবেন
প্রতিটি জেলা সদরেই থাকার জন্য পর্যাপ্ত হোটেল রয়েছে।

/মহু



  বিষয়:   আম  পর্যটন  ট্রাভেল  ঘোরাঘুরি  চাঁপাইনবাবগঞ্জ  রাজশাহী  নওগাঁ 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: