হাসপাতালের অলিগলি মাড়িয়ে যখন ডেস্কে এসে বসলাম, তখন ভেতরটায় প্রায় ফাঁকা মানুষ হয়ে আছি। এদিকে বেলা গড়িয়ে বিকেল, তার পিছু পিছু বিদায় নিচ্ছে ‘বন্ধু দিবস’। অথচ দুনিয়াজুড়ে যুদ্ধ, হানাহানি ও বিচ্ছেদের খবর লিখতে হবে ভেবে হাসপাতাল ফেরত ফাঁকা আমিটা তখন ভীষণ একা বোধ করছি! এ একাকীত্বে কি বন্ধু দরকার? কিন্তু সামনের এ যন্ত্রের সীমানা পেরিয়ে আমার কী কোনো বন্ধু আছে— এ প্রশ্ন মনে-মগজে লিকলিকিয়ে ওঠে। তখন সেই প্রশ্নের ডগায় দাঁড়িয়ে দৃষ্টি চলে যায় সামনে থাকা কাঁচঘেরা সুউচ্চ ভবনের দিকে। সেখানে কাঁচের ফাঁকে ছোট্ট একটি পাকুড় গাছ সন্ধ্যালগ্ন বাতাসে হেলছেন-দুলছেন; আমাকে ডাকছেন। নরম সবুজ আভায় রাঙিয়ে দিচ্ছেন আমায়। ভাবছি, আমার বিগত সব ‘ফাঁকা মানুষ’ দিনের বন্ধু কী ওই নিঃসঙ্গ পাকুড় গাছ? আবার এও তো হতে পারে, ওই চারা গাছ প্রশ্ন করছেন— তুমি কি তোমার বন্ধু হলে এবার?
ধরে নিলাম গাছটা প্রশ্নই করল— তাহলে এবার নিজের সঙ্গে বসে উত্তর খুঁজতে পারি। এককাপ অর্থোডক্স ব্ল্যাক-টি নিয়ে ভাবতে বসলাম, আমি কি আদতে আমার বন্ধু হতে পারলাম। তখন কানে বাজছিল সায়ানের গান, ‘কেন বাড়লে বয়স ছোট্টবেলার বন্ধু হারিয়ে যায়’। আমাদের বোধে যখন এসে ধরা দেয় ‘বন্ধু, তুমি শুনতে পাচ্ছো কি’, তখন কোটি জনতার মাঝে একটি ‘বন্ধুমুখ’ আর আমাদের জন্য থাকে না। এ শূন্যতার আবিষ্কার ঘটে গেলে আমরা ছোট্টবেলার খেলার সাথিদের বন্ধু ডেকে ডেকে স্মৃতির বিভ্রান্তিতে আটকে পড়ি। যেমন গানের মানুষ সায়ান আটকেছেন ‘ছোট্টবেলার বন্ধু’ বিভ্রান্তিতে। বোধের দেয়াল পেরিয়ে যখন সবেমাত্র বন্ধু-বন্ধু রঙা কিছু মানুষ একসঙ্গে জীবনখেলা দেখতে বসে, তখনও হাজির হয় মাকড়শার জাল। এইতো সেদিনও শুনছিলাম কৃষ্ণকলি ইসলামের গলায়— ‘বন্ধু আমার, বন্ধু তুমি, বন্ধু মোরা ক’জন, তবুও বন্ধু মন হলো না আপন।’ মাথাটা কেমন গুলিয়ে দেয়— আপন নয় যে-জনা, তাকেও কোন বিভ্রমে বন্ধু ডাকি?
এসব সব প্রশ্নের খাদে ডুবে আছি, একদম বাসি ডালের পাতিলে ডুবে থাকা আধমরা তেলাপোকার মতন। এ যে অবস্থার কথা বললাম, অন্তত সে ডুবে যাওয়া থেকে ভাসিয়ে তুলতেও আমার/আমাদের চাই অন্তত একটি ‘বন্ধুমুখ’। বরং ডুবে থাকা অবস্থায় কাঁচের ফাঁকে জন্ম নেয়া সেই গাছের দিকে তাকাই। তার তবে বন্ধু গাছটি কে, জানতে চাই। দেখি সবুজ কাঁচে পড়েছে এক প্রতিবিম্ব ওই দুলতে থাকা গাছের, তাকেই বন্ধু ভেবে হাসছে বুঝি! যদি তাই হয়, গাছও কি আমায় বলছে তবে, নিজের বন্ধু হও, হে বিষণ্ণ চোখের মানুষ!
আমি জল থেকে নাক উঁচু করে গাছের কথা শুনছি— তিনি বলেছেন, এই যে মাথা এলিয়ে তুমি ডুবে যাচ্ছো, একবার আগল খুলে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাও। আমি তাকালাম এবং আমার স্মৃতিতে এলো শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে এক ভরা পূর্ণিমার রাত। সে রাত পুরোটা কাটিয়েছিলাম নদীর ঢেউ তোলা জলে চাঁদের টুকরো টুকরো হওয়া প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে। সে রাতের জলোয়াচাঁদ আজ ধরা পড়ছে আকাশে ঝুলে থাকা চাঁদের বন্ধু রূপে।
সহকর্মী জয় দাসের সঙ্গে কথায় কথায় উঠে এলো, ‘মানুষ কি নিজের বন্ধু হতে পারে?’ বিষয়ক প্রশ্ন। অনেক এলোমেলো কথা থেকে ছেঁকে তুললে এমন দাঁড়ায়, বন্ধুর বিষয় ভাবতে গেলেই মানুষকে পেয়ে বসে স্মৃতিকাতরতা, শৈশব হাতড়ে এ-নাম, ও-নাম খুঁজে ফেরার বিষণ্ণতা। ফলে এ মানুষ হালভাঙা নাবিকের পরিস্থিতিতে পড়লে কখনও নিজেই নিজের বাবা হয়ে পিঠে হাত বোলায়। কখনও ভাই হয়ে কানে কানে বলে, আরে এইতো আছি। আবার প্রিয় শিল্পীর কথা ধার নিয়ে নিজেকে গান গেয়ে শোনায় এ অদ্ভুত প্রাণী।
অথচ এতো এতো আলাপের পর জয় বিদায় নিলে আমাকে পেয়ে বসে আঁধারের মায়া। স্বল্পকালের বিদায়ও আমার চোখে হাজির করে, কেবলই একটি ‘মানুষ ছায়া’ হারিয়ে গেল। আমার মনে হতে থাকে, তাও তো বন্ধু আছে কোথাও! আমি কি তাকে পাচ্ছি, আমাকেই বা পাচ্ছে কোনও প্রাণ বন্ধুমুখ রূপে! আমি আবার তাকাই ওই গাছে দিকে, তিনি কাঁচের ভাঁজে হেলছেন-দুলছেন। আমিও বোধহয় মৃদু হাসছি, আর বলছি- নতুন আলোয় আবার দেখা হবে আপনার সঙ্গে হে ক্ষুদে পাকুড়।
সময়ের আলো/কেআই