দুর্নীতির মামলায় দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাংলাদেশে দায়ের হওয়া দুর্নীতি মামলার প্রেক্ষিতে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ কার্যকরের অংশ হিসেবে তাকে আটক করেছে দুবাই পুলিশ।
রোববার (১৪ জুন) সংশ্লিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ফলেই সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে শনাক্ত ও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়েছে।
এর আগে দুর্নীতি দমন কমিশনের আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি করা হয়। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা মহানগর সিনিয়র বিশেষ জজ আদালত এ সংক্রান্ত আদেশ দেন।
আরও পড়ুন
কী অভিযোগ রয়েছে বেনজীরের বিরুদ্ধে
দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তে বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠে আসে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে তার, তার স্ত্রী এবং দুই কন্যার বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়ের করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যদের নামে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে এসব সম্পদের উৎস ও মালিকানা নিয়ে নানা অসঙ্গতির তথ্য উঠে আসে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা: ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর দুদকের পক্ষ থেকে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে বেনজীর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
অভিযোগপত্র বা চার্জশিট: দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে দুদক। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেনজীর তার দাখিল করা সম্পদ বিবরণীতে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ গোপন করেছেন এবং তার নামে অন্তত ১১ কোটি ৪ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেছে।
আদালতের পরোয়ানা: অভিযোগপত্র গ্রহণের পর চলতি বছরের মার্চ মাসে ঢাকার একটি বিশেষ আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। এরপর মে মাসে তার অনুপস্থিতিতেই আদালতে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও পলাতক জীবন
বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা: ২০২১ সালের ডিসেম্বরে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর ও ট্রেজারি বিভাগ র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়, যার মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।
২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে তার বিশাল অবৈধ সম্পদের খতিয়ান গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই তিনি সপরিবার আত্মগোপনে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি বাংলাদেশ ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপের কোনো দেশে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে তার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত।
দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করা বেনজীর আহমেদ একসময় পুলিশ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি পুলিশের মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের আগে ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন।
দুবাইয়ে গ্রেফতারের ঘটনায় এখন তার বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো অনুসরণ করে পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
এএডি/