শিবির নেতা জিসান ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ

সংসদ প্রতিবেদক

জাতীয়

নিখোঁজ ছাত্র শিবিরের নেতা জিসানকে উদ্ধার পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ধর্ষণ মামলা নিয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতি

2026-06-14T19:09:14+00:00
2026-06-14T19:09:14+00:00
 
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩০ ভাদ্র ১৪৩৩
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জাতীয়
শিবির নেতা জিসান ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ
সংসদ প্রতিবেদক
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৭:০৯ পিএম 
শিবির নেতা জিসান ইস্যুতে উত্তপ্ত সংসদ। ছবি : সংগৃহীত
নিখোঁজ ছাত্র শিবিরের নেতা জিসানকে উদ্ধার পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ধর্ষণ মামলা নিয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বিবৃতি এবং তা নিয়ে বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রোববার কিছু সময়ের জন্য উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সংসদ অধিবেশন। তীব্র হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে রুলিং দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন স্পিকার। এর আগে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ দুবাইয়ে আটক হয়েছে এবং দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া চলছে।

বিকেলে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে পৃথক দুইটি বিবৃতি দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদকে নিয়ে দেওয়া বক্তব্যকে সরকার ও বিরোধী দল টেবিল চাপড়ে স্বাগত জানালেও শিবির নেতা জিসানকে সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিবাদ জানায় বিরোধী দল। এ নিয়ে অধিবেশন কক্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্পিকার মাইক বন্ধ করে দিলেও মাইক ছাড়া তর্কে জড়িয়ে পড়েন সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যরা। স্পিকার বার বার থামানোর চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু বিরোধী দলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে হইচই করতে থাকেন। পরে স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রুলিং দেওয়া হয়। পরে সম্পূরক বাজেটের উপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলীয় সদস্যা একই বিষয়ে আবারও কথা বলেন।

এর আগে সংসদ অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১১ জুন কুমিল্লা থেকে বাংলাদেশ ছাত্র শিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ জিসান মিয়া প্রধান নিখোঁজ হয়েছেন বলে প্রচার করা হয় এবং এ বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে উদ্বেগ তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। তবে তদন্তে ভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। দেখাগেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্রে এক নারীর সঙ্গে জিসানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ওই নারীর সঙ্গে একাধিকবার শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেন তিনি। ফলে নারীটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে পরে তাকে জোর করে ভ্রূণ নষ্টের ওষুধ খাওয়ানো হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১২ জুন তাদের বিয়ের দিন নির্ধারিত ছিল। কিন্তু বিয়েতে না বসার উদ্দেশ্যে ১১ জুন রাতে জিসান নিজেই আত্মগোপন করেন। পরবর্তীতে পুলিশি অনুসন্ধানের মাধ্যমে তাকে কুমিল্লার লাকসাম এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে জিসানসহ চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে দুই আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রকৃত তথ্য জাতির সামনে তুলে ধরার স্বার্থেই বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই ফ্লোর নিয়ে তীব্র আপত্তি জানান বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাহের। এ সময় বিরোধী দলের অন্য সদস্যরাও দাঁড়িয়ে যান। এ সময় বিরোধীদলীয় উপনেতা তাহের বলেন, ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যের সুযোগ ব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক দলকে লক্ষ্য করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। একটি বিচারাধীন এবং বিতর্কিত বিষয়কে সংসদে এভাবে উপস্থাপন করা দেশের সংসদীয় ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এতে সংসদের মর্যাদা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। তিনি জানতে চান, জিসান বর্তমানে কোথায় অবস্থান করছেন, কেন সাংবাদিকদের তার সঙ্গে কিংবা অভিযোগকারী নারীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না এবং পুরো ঘটনায় কোনো সাজানো নাটক বা ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না? তিনি অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে একতরফা তথ্য সংসদে উপস্থাপন করা হয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই কাউকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা অনুচিত।
বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যের সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি দলের সদস্যদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তারা নিজেদের আসন থেকে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখান বিরোধী দলের সদস্যরাও। একপর্যায়ে সংসদ কক্ষে উচ্চস্বরে বাগ্‌বিতণ্ডা, চিৎকার এবং হট্টগোল শুরু হয়। ডেপুটি স্পিকার একাধিকবার সদস্যদের শান্ত হওয়ার এবং নিজ নিজ আসনে বসার আহ্বান জানান। এমনকি কিছু সময়ের জন্য মাইকও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবুও উভয় পক্ষের সদস্যদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক চলতে থাকে। সংসদ কক্ষে কয়েক মিনিট ধরে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি বিরাজ করে। স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়।

উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে রুলিং দিয়ে ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির ৩০০ বিধিতে প্রদত্ত বক্তব্যের পর সাধারণত কোনো প্রশ্ন বা বিতর্কের সুযোগ নেই। তবে বিশেষ বিবেচনায় বিরোধীদলীয় উপনেতাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে যদি সংসদীয় রীতিনীতির পরিপন্থি বা অসংসদীয় কোনো শব্দ কিংবা মন্তব্য থেকে থাকে, তাহলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী সময়ে সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এর আগে আলাদা বিবৃতিতে সংসদ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলোচিত ও সমালোচিত সাবেক পুলিশপ্রধান বেনজীর আহমেদকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত বেনজীরকে আইনের আওতায় আনতে ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় শুরু করে। পুলিশ সদর দপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ঢাকা এ বিষয়ে ইন্টারপোলে আবেদন পাঠায়। গত বছরের ১১ এপ্রিল আবেদন পাঠানোর পর বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে ইন্টারপোল ২০২৫/২৩৯ নম্বর ফাইল এবং ৫৭৪/২০২৫ কন্ট্রোল নম্বরের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে। রেড নোটিশ জারির পর ইন্টারপোল সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বেনজীরকে গ্রেফতারের অনুরোধ জানায়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১২ জুন আবুধাবিভিত্তিক এনসিবি থেকে পাঠানো এক ই-মেইলে বাংলাদেশ সরকারকে জানানো হয়, বেনজীর আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে দুবাইয়ে আটক রয়েছেন।


বিবৃতিতে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ইউএইর ফেডারেল আইন অনুযায়ী গ্রেফতারের ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, জাল নথি ব্যবহার, সহায়তা প্রদান, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারা এবং পাসপোর্ট আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রত্যর্পণের জন্য প্রয়োজনীয় মামলা-সংক্রান্ত নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং গ্রেফতারি পরোয়ানার কাগজপত্র প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠাবে এবং এনসিবি ঢাকা ও এনসিবি আবুধাবির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বেনজীরকে গ্রেফতারের ঘটনাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে নতুন দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। সরকার জাতিকে এই বার্তাই দিতে চায় যে অপরাধী যত ক্ষমতাধর বা প্রভাবশালীই হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল ইন্টারপোল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে। এর আগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে সাবেক এই পুলিশপ্রধানসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সময়ের আলো/জেডআই
  বিষয়:   শিবির নেতা জিসান  সংসদ 


Advertisement
Loading...
Loading...
জাতীয়- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: