পণ্যমূল্য নিয়ে তবু ভয়

এসএম আলমগীর

অর্থনীতি

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন

2026-06-15T02:27:10+00:00
2026-06-15T02:37:04+00:00
 
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
অর্থনীতি
স্বস্তির জন্য বাজেট
পণ্যমূল্য নিয়ে তবু ভয়
এসএম আলমগীর
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ২:২৭ এএম  আপডেট: ১৫.০৬.২০২৬ ২:৩৭ এএম  (ভিজিট : ৯)
সময়ের আলো গ্রাফিক
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার যে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করেছেন তাতে পণ্যমূল্য কমানোর অনেকগুলো উপকরণ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ৬০টির অধিক নিত্যপণ্যের ট্যাক্স কমানো হয়েছে। 

কৃষি উপকরণ-সার, বীজ, কীটনাশকের দাম কমানোয় জোর দেওয়া হয়েছে। উৎপাদন খরচ কমাতে শিল্পে ‘ছাড়ের ছড়াছড়ি’ রাখা হয়েছে। আবার নিম্নআয়ের মানুষের আয় বাড়াতে সামাজিক নিরাপত্তায় জোর দেওয়া হয়েছে। এ খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাতে নিম্নআয়ের মানুষ বাজারের চাপ সামলাতে পারে। এসব কারণেই নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এত পদক্ষেপ রাখা হলেও বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশের কাছে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি রয়েছে সেটি কমিয়ে আনা কঠিন হবে। কারণ সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি হবে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। 

কিন্তু আইএমএফ বলছে আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি হবে ৮ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকও একই রকম পূর্বাভাস দিয়েছে। তাই মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামানো খুব কঠিন হবে বলে মত অর্থনীতিবিদদের।

এ বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সময়ের আলোকে বলেন, নতুন বাজেটে পণ্যমূল্য কমানোর অনেক উদ্যোগ আছে। অনেকগুলো ভোগ্যপণ্যের শুল্ক-কর কমানো হয়েছে-এটা সত্য। কিন্তু শুল্ক কর কমালেই যে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে সেটি ভাবা ঠিক হবে না। 

মূল্যস্ফীতি কমার ক্ষেত্রে আরও কিছু অর্থনৈতিক গতিবিধির ওপর নির্ভর করছে। কারণ বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানির বাজার টালমাটাল। সরকার ইতিমধ্যেই দুদফা জ্বালানির দাম বাড়িয়েছে, একবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। 

আগামীতে হয়তো আবারও বাড়ানো লাগতে পারে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব ভোগ্যপণ্য থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই পড়বে। তখন পণ্যমূল্য না কমে উল্টো আরও বাড়তে পারে। এ ছাড়া ডলারের উচ্চমূল্যের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়বে, আবার বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করতে গিয়ে নতুন টাকা ছাপানো লাগতে পারে। টাকা ছাপিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে গেলে মূল্যস্ফীতি না কমে আরও বেড়ে যাবে। 

তাই বাজেটে পণ্যের শুল্ক কমালেই মূল্যস্ফীতি কমবে-এটা এখনই বলা যাবে না।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বাজেটের ঘাটতি মেটাতে টাকা ছাপানো লাগতে পারে। এবারের বাজেট ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে নেবে সরকার। ব্যাংকে টাকা না থাকলে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপাতে পারে। টাকা ছাপালে জিনিসের দাম অটো বেড়ে যায়।

অন্যদিকে বাজারে সিন্ডিকেট আর আস্থাহীনতাও রয়েছে। তাই ট্যাক্স কমালেই দাম কমে না। গতবারও দেখা গেছে, আমদানি শুল্ক কমানোর পরও পেঁয়াজ-চিনির দাম কমেনি। কারণ মজুদদারি, চাঁদাবাজি, পরিবহন খরচ। মানুষের আস্থা নেই যে এবার কমবে। নতুন বাজেট ২০২৬-২৭ এ পণ্যমূল্য কমাতে সরকার কয়েকটা সরাসরি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো উৎপাদন খরচ আর আমদানি খরচ কমানো।

যদিও বাজেটে নিত্যপণ্যে করছাড় ও শুল্ক কমানো হয়েছে। বিশেষ করে একগুচ্ছ নিত্যপণ্যে করছাড় করা হয়েছে। যেমন- চাল, ডাল, তেল, চিনির মতো দৈনন্দিন জিনিসে ভ্যাট-ট্যাক্স কমানো হয়েছে। আবার মসলাজাতীয় পণ্য- পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, মরিচ- এসব মসলায় আমদানি শুল্ক ও ভ্যাটে বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। কারণ এগুলোর দামই হুট করে বাড়ে।

আবার কৃষি উপকরণের দাম কমানোর জোর দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষকের উৎপাদন খরচ কমাতে এসব জিনিসে ভর্তুকি ও করছাড় বাড়ানো হয়েছে। কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন- ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কৃষকের খরচ কমলে ধান-সবজির উৎপাদন বাড়বে, বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কমবে। 

এ ছাড়া বাজেটে শিল্পের উৎপাদন খরচ কমাতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিল্পে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো হয়েছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্পে।

আবার সেবা খাতেও বেশ কিছু সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যেমন- পরিবহন, গুদামজাতকরণের মতো সেবা খাতে কর কমানো হয়েছে। এর ফলে পণ্য আনা-নেওয়ার খরচ কমলে চূড়ান্ত দামেও প্রভাব পড়বে। সামাজিক নিরাপত্তা দিয়ে চাপ কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এ জন্য এ খাতে নতুন বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে দাম একদম না কমলেও গরিব মানুষ যেন কিনতে পারে। তা ছাড়া টিসিবির মাধ্যমে কম দামে নিত্যপণ্য বিক্রি, বয়স্ক-বিধবা ভাতা বাড়ানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  

এত উদ্যোগের পরও মূল্যস্ফীতি কমার বিষয়ে সমস্যা কোথায়। বিশ্লেষকরা বলছেন, পদক্ষেপ আছে কিন্তু বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ আছে। উচ্চ ডলার রেটে পণ্য আমদানি করলেই দাম বেড়ে যায়। বিদ্যুৎ-ডিজেলের দাম বাড়লে কারখানা থেকে দোকান, সবখানে খরচ বাড়ে। আবার ট্যাক্স কমালেও মজুদদাররা দাম না কমালে লাভ নাই। এ জন্য বাজেটে পণ্যমূল্য কমানোর ‘ওষুধ’ দেওয়া হয়েছে- ট্যাক্স কমানো, ভর্তুকি বাড়ানো। কিন্তু ‘রোগ’ যদি ডলার সংকট আর সিন্ডিকেট হয়, তা হলে শুধু এই ওষুধে কাজ হবে কি না সেটাই প্রশ্ন বিশ্লেষকদের। 

মধ্যবিত্তের কাঁধেই বাড়তি বোঝা : 

এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দীর্ঘদিন ধরেই নাভিশ্বাস উঠেছে দেশের মধ্যবিত্তের। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম এখনও স্বাভাবিক হয়নি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যয় বেড়েছে, বাড়িভাড়া ও যাতায়াত খরচও ঊর্ধ্বমুখী। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে করমুক্ত আয়ের সীমা কিছুটা বাড়ানো হলেও সামগ্রিকভাবে মধ্যবিত্তের ওপর করের চাপ আরও বাড়তে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, কর বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবসায়ী নেতারা।

বাজেটে ব্যক্তি করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে পৌনে চার লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিতে এটি স্বস্তিদায়ক মনে হলেও একই সঙ্গে ৫ শতাংশের সর্বনিম্ন কর ধাপ বাতিল করে ১০ শতাংশের নতুন প্রাথমিক করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির যে সুবিধা পাওয়া যেত, তার বড় অংশই হারিয়ে যাচ্ছে।

কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের চাকরিজীবীরা, যারা নিয়মিত কর দেন এবং সীমিত আয়ের মধ্যেই সঞ্চয় ও বিনিয়োগ করার চেষ্টা করেন।

করমুক্ত সীমা বাড়লেও কেন বাড়ছে কর? : 

প্রস্তাবিত কর কাঠামো অনুযায়ী আগামী দুই অর্থবছরে প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আয় করমুক্ত থাকবে। এরপরের ৩ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, পরবর্তী ৪ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ, তার পরের ৫ লাখ টাকার ওপর ২০ শতাংশ এবং পরবর্তী ২০ লাখ টাকার ওপর ২৫ শতাংশ হারে কর দিতে হবে। অবশিষ্ট আয়ের ওপর করহার থাকবে ৩০ শতাংশ।
কাগজে-কলমে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো হলেও ৫ শতাংশের কর ধাপ তুলে দেওয়ার কারণে করদাতাদের বড় অংশকে সরাসরি দ্বিগুণ হারে কর দিতে হবে। ফলে যাদের আয় করযোগ্য সীমার সামান্য ওপরে, তাদের করের বোঝা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এমন পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়সীমা আরও বেশি বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। কারণ প্রকৃত অর্থে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। কিন্তু বাজেটে সেই বাস্তবতার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায়নি।

সঞ্চয়পত্রেও কমছে সুবিধা :

বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা আয়ের ওপর বিদ্যমান কর সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে উৎসে কাটা করই চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বিবেচিত হয়। নতুন ব্যবস্থায় সঞ্চয়পত্রের সুদ মোট আয়ের সঙ্গে যোগ হবে এবং সংশ্লিষ্ট কর স্ল্যাব অনুযায়ী কর দিতে হবে। ফলে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীদের একটি বড় অংশ অতিরিক্ত করের মুখে পড়বেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত ও অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক। তাদের জন্য এটি কার্যত আরেকটি করের বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে। 

সময়ের আলো/জেডি 




  বিষয়:   পণ্যমূল্য  ভয়  বাজেট  স্বস্তি 


Loading...
Loading...
অর্থনীতি- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: