প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় সামাজিক অঙ্গীকার

ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ

মতামত

প্রতি বছর ১৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস। প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা, অবহেলা, আর্থিক শোষণ, মানসিক নির্যাতন

2026-06-15T10:39:34+00:00
2026-06-15T10:39:34+00:00
 
  সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬,
১ আষাঢ় ১৪৩৩
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬
মতামত
বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস
প্রবীণদের অধিকার রক্ষায় সামাজিক অঙ্গীকার
ডা. মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: সোমবার, ১৫ জুন, ২০২৬, ১০:৩৯ এএম   (ভিজিট : ৫)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রতি বছর ১৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস। প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা, অবহেলা, আর্থিক শোষণ, মানসিক নির্যাতন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি এবং তাদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ এ দিবস পালন করে। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এবং জীবনমানের অগ্রগতির ফলে বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে চলেছে প্রবীণদের প্রতি অবহেলা ও নির্যাতনের ঘটনা।

প্রবীণরা একটি জাতির অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও মূল্যবোধের ভান্ডার। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে তাদের অবদান অপরিসীম। অথচ জীবনের শেষ অধ্যায়ে এসে অনেকেই অবহেলা, একাকিত্ব ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার হন। বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় এবং প্রবীণবান্ধব সমাজ গঠনের আহ্বান জানায়।

দিবসটির পটভূমি
প্রবীণ নির্যাতন দীর্ঘদিন ধরে একটি নীরব সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে নির্যাতনের ঘটনা পরিবারের অভ্যন্তরে ঘটে এবং সামাজিক লজ্জা, নির্ভরশীলতা কিংবা ভয়ের কারণে ভুক্তভোগীরা তা প্রকাশ করেন না। ফলে প্রকৃত চিত্র অনেক সময় আড়ালেই থেকে যায়।

এই প্রেক্ষাপটে প্রবীণদের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুরুত্ব পেতে শুরু করে। জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রবীণদের প্রতি সহিংসতা, বৈষম্য ও অবহেলাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে এবং বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ১৫ জুনকে বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী প্রতি ৬ জন প্রবীণের মধ্যে অন্তত ১ জন কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। বিশ্বে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব মানুষের প্রায় ১৫.৭ শতাংশ প্রবীণ নির্যাতনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ৩ জন কর্মীর মধ্যে প্রায় ২ জন প্রবীণদের প্রতি কোনো না কোনো ধরনের অপব্যবহারের কথা স্বীকার করেছেন।

২০১৫ সালে বিশ্বে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৯০ কোটি। ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ২০০ কোটিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে প্রবীণ নির্যাতনের শিকার মানুষের সংখ্যা ৩২ কোটিরও বেশি হতে পারে। এই পরিসংখ্যানগুলো স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে প্রবীণ নির্যাতন শুধু সামাজিক নয়, একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ও মানবাধিকার সংকট।

প্রবীণ নির্যাতন কী?
প্রবীণ নির্যাতন বলতে এমন কোনো কাজ বা অবহেলাকে বোঝায়, যা একজন বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বা আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়। এটি পরিবার, আত্মীয়স্বজন, পরিচর্যাকারী, প্রতিবেশী কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও ঘটতে পারে।

প্রবীণ নির্যাতনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অনেক সময় নির্যাতনকারীরা ভুক্তভোগীর নিকটতম মানুষ হয়ে থাকেন। ফলে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা প্রতিকার চাইতেও দ্বিধাবোধ করেন।

প্রবীণ নির্যাতনের ধরন
শারীরিক নির্যাতন : মারধর, ধাক্কা দেওয়া, আঘাত করা, জোরপূর্বক আটকে রাখা কিংবা শারীরিক কষ্ট দেওয়া।
মানসিক নির্যাতন : অপমান, গালাগাল, হুমকি, তুচ্ছতাচ্ছিল্য, অবজ্ঞা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে মানসিক কষ্ট দেওয়া।
আর্থিক নির্যাতন : সম্পত্তি আত্মসাৎ, জোরপূর্বক দলিলে স্বাক্ষর করানো, অর্থ হাতিয়ে নেওয়া কিংবা আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া।
অবহেলা : খাদ্য, চিকিৎসা, ওষুধ, নিরাপদ বাসস্থান ও প্রয়োজনীয় পরিচর্যা থেকে বঞ্চিত করা।
সামাজিক নির্যাতন : পারিবারিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া।

প্রবীণ নির্যাতনের কারণ
প্রবীণ নির্যাতনের পেছনে বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক কারণ কাজ করে।

পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়
নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ায় প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাচ্ছে।

একক পরিবার ব্যবস্থা
যৌথ পরিবারের পরিবর্তে একক পরিবার বৃদ্ধির ফলে অনেক প্রবীণ একাকী হয়ে পড়ছেন।

র্থনৈতিক চাপ
দারিদ্র্য, বেকারত্ব এবং আর্থিক সংকট অনেক সময় প্রবীণদের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করে।

সম্পত্তিগত বিরোধ
উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ প্রবীণ নির্যাতনের অন্যতম কারণ।

স্বাস্থ্যগত নির্ভরশীলতা
অসুস্থতা ও শারীরিক দুর্বলতার কারণে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া প্রবীণদের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে ঐতিহ্যগতভাবে প্রবীণদের সম্মান করার সংস্কৃতি বিদ্যমান। কিন্তু নগরায়ণ, কর্মব্যস্ত জীবন, বিদেশমুখী কর্মসংস্থান এবং সামাজিক পরিবর্তনের ফলে অনেক প্রবীণ আজ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করছেন।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, সন্তানদের সঙ্গে থেকেও তারা মানসিকভাবে একাকী। সম্পত্তি হস্তান্তরের পর অবহেলা ও দুর্ব্যবহারের শিকার হন। পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও পরিচর্যা পান না। পারিবারিক সিদ্ধান্তে তাদের মতামতকে মূল্য দেওয়া হয় না। সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় বিষণ্নতা বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য
দেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই এখনই প্রবীণবান্ধব নীতি ও কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রবীণদের মর্যাদা
ইসলাম প্রবীণদের সম্মান, সেবা ও যত্নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে।

কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁরই ইবাদত করো এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করো। তাদের একজন বা উভয়েই যদি তোমার কাছে বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না এবং তাদের ধমক দিয়ো না; বরং সম্মানজনক কথা বলো। (সুরা আল-ইসরা : ২৩)
তিনি আরও বলেন, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন। (সুরা আল-ইসরা : ২৪)

হাদিসের শিক্ষা
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে আমাদের ছোটদের প্রতি স্নেহ করে না এবং বড়দের সম্মান করে না, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় (তিরমিজি : ১৯২১)। তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো বৃদ্ধ মুসলমানকে তার বার্ধক্যের কারণে সম্মান করে, আল্লাহ তার বার্ধক্যে তাকে সম্মান করার জন্য লোক নির্ধারণ করে দেন। (তিরমিজি : ২০২২)। ইসলামের এসব শিক্ষা প্রমাণ করে যে প্রবীণদের সম্মান করা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, বরং ঈমানি কর্তব্যও।

প্রবীণ নির্যাতনের পরিণতি
প্রবীণ নির্যাতনের প্রভাব বহুমাত্রিক। মানসিক বিষণ্নতা ও হতাশা বৃদ্ধি পায়। আত্মসম্মান ও আত্মবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়। স্মৃতিশক্তি ও মানসিক সক্ষমতা হ্রাস পায়।
দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অসুস্থতা জটিল আকার ধারণ করে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বৃদ্ধি পায়। আত্মহীনতা ও জীবনের প্রতি অনাগ্রহ তৈরি হয়। মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায়।

প্রতিরোধে করণীয়
পরিবার পর্যায়ে : প্রবীণ সদস্যদের সম্মান ও ভালোবাসা প্রদান। নিয়মিত সময় দিয়ে তাদের খোঁজখবর নেওয়া। চিকিৎসা, পুষ্টি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ধৈর্য ও সহানুভূতির সঙ্গে আচরণ করা।
সমাজ পর্যায়ে : প্রবীণবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা। সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ সৃষ্টি। সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি।
রাষ্ট্র পর্যায়ে : প্রবীণ কল্যাণনীতি কার্যকর বাস্তবায়ন। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ। জেরিয়াট্রিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন। আইনি সহায়তা ও অভিযোগ ব্যবস্থার উন্নতি। প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা।
দিবসটির তাৎপর্য : বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন; তারা পরিবার ও সমাজের মূল্যবান সম্পদ। তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা জাতির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রবীণদের সম্মান করা মানে নিজের ভবিষ্যৎকে সম্মান করা। আজকের তরুণরাই আগামী দিনের প্রবীণ। তাই প্রবীণদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবাধিকার রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ সমাজকে সুরক্ষিত করা। বিশ্ব প্রবীণ নির্যাতন সচেতনতা দিবস ২০২৬ উপলক্ষে আমাদের অঙ্গীকার হোক কোনো প্রবীণ যেন অবহেলা, নির্যাতন বা একাকিত্বের শিকার না হন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠুক। এমন একটি মানবিক বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি প্রবীণ মানুষ সম্মান, ভালোবাসা, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।

লেখক ও জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকমতামত লেখকের নিজস্ব



Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: