কর-শুল্ক ফাঁকি বন্ধ না হলে কমবে না রাজস্ব ঘাটতি

মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন

মতামত

কর ফাঁকি বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশের জন্য একটি বিরাট সমস্যা। প্রতি বছর একদিকে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে

2026-06-14T06:06:07+00:00
2026-06-14T06:06:07+00:00
 
  রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬,
৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬
মতামত
কর-শুল্ক ফাঁকি বন্ধ না হলে কমবে না রাজস্ব ঘাটতি
মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
প্রকাশ: রোববার, ১৪ জুন, ২০২৬, ৬:০৬ এএম   (ভিজিট : ১০)
গ্রাফিক : সময়ের আলো
কর ফাঁকি বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশের জন্য একটি বিরাট সমস্যা। প্রতি বছর একদিকে বিপুল পরিমাণ কর ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক প্রতিষ্ঠান কর দিতে গিয়ে সমস্যার মুখে পড়ছে। কর ফাঁকি রোধে আইনের যেমন দুর্বলতা রয়েছে তেমনি আছে আইন প্রয়োগে প্রশাসনের উদাসীনতা। 

কর ফাঁকির কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছর আনুমানিক ২ লাখ ২৬ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে বাংলাদেশ। সিপিডি বলছে, উচ্চ করহার, দুর্বল নজরদারি, জটিল আইন-কানুন ও ব্যবস্থায় ব্যাপক দুর্নীতি কর ফাঁকির মূল কারণ। 

বাংলাদেশের কর শুল্কনীতি সুষ্ঠু ও ন্যায্য নয়। এ দেশে বড় বড় পুঁজিপতি ন্যায্য হারে কর-শুল্ক প্রদান করে না। অনেকে হয়রানির ভয়ে কর দিতে চান না। অন্যদিকে কর ফাঁকি দিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী পার পেয়ে যাচ্ছে। এখানে গরিবের তুলনায় ধনীরাই অধিক কর ফাঁকি দেন। 

যার ফলে গরিবরা দিন দিন নিঃস্ব হচ্ছে আর ধনীরা হাজার-লাখ কোটি টাকার মালিক হচ্ছে। আবার দেশের করব্যবস্থা ব্যবসাবান্ধব নয়। ছোট ছোট করদাতার তুলনায় বড় করদাতারা অধিক হারে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। করব্যবস্থার বিভিন্ন পর্যায়ে অতিরিক্ত উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়। উৎসে ও অগ্রিম কর থেকে ৮৫ শতাংশ আয়কর অর্জন হয়। ঠিকাদার, আমদানিকারক ও ব্যাংক গ্রাহকরা উৎসে করের বেশিরভাগ পরিশোধ করেন। ফলে কার্যকরভাবে করহার অনেক বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশের অধিক কর আরোপ করা হয়। বাংলাদেশে করপোরেট করহার সাড়ে ৩২ শতাংশ। 

বৈশ্বিক পর্যায়ে করপোরেট ট্যাক্স হার কমে আসছে। দুর্ভাগ্যবশত বাংলাদেশে বেড়েছে। করপোরেট করহার কমিয়ে করজাল বাড়িয়ে ট্যাক্স আদায় করা দরকার। অর্থনীতিবিদরা বারবার বলা সত্ত্বেও তৎকালীন সরকার তা বাস্তবায়ন করেনি। 

বিগত হাসিনা সরকার গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষের কাছ থেকে উচ্চহারে কর আদায় করেছে, অন্যদিকে উচ্চবিত্ত শিল্পপতি ব্যবসায়ীদের বছরের পর বছর কর ছাড় প্রদান করেছে। বাংলাদেশে অনেক বড় বড় করপোরেট ব্যবসায়ী রয়েছেন যারা নিয়মিত কর-শুল্ক প্রদান করেন না। অধিকন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এনবিআরকে বশীভূত করে কর ফাঁকি দিচ্ছেন। ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে কর-শুল্ক খাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ে ভরাডুবির মধ্যে শুল্ক ছাড়ে সরকারের উদারতা রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থসংকট আরও তীব্র হয়েছে। যেটার প্রভাব পড়েছে চলতি অর্থবছরের বাজেটে। 

বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। কারণ এ দেশে জনসংখ্যার তুলনায় খুব কম লোক প্রত্যক্ষ কর দেন। আবার যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপরেই কর দেওয়ার চাপ বেশি। বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনও করের আওতার বাইরে। এ দেশে ৬৫ শতাংশ সচ্ছল করদাতা রয়েছে যারা সঠিক করের তথ্য বা পরিমাণ প্রকাশ করে না। 

এটাও বাস্তব যে, একবার কর দিয়ে নিরীক্ষায় পড়লে নানা ধরনের হয়রানির স্বীকার হতে হয়। হয়রানির ভয়ে অনেকে কর দিতে চান না। সিপিডির মতে, দেশের সরকারি করব্যবস্থায় রয়েছে গলদ। একজন করদাতা নিয়মিতভাবে উচ্চ হারে কর দিলেন। কিন্তু সরকার ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিল। ফলে কর ফাঁকি দিয়ে যারা টাকা লুকিয়ে রাখলেন; তারা বেশি সুবিধা পেলেন। এটি সৎ করদাতাদের জন্য অন্যায় নীতি। এ কারণেও অনেক করদাতা কর দিতে চান না। সেই হিসেবে বাংলাদেশে ধনীদের তুলনায় গরিব-মধ্যবিত্তরা অধিক কর দেয়। 

এ দেশে গরিবদের ওপর ট্যাক্স বাড়ানো হয় আর ধনীদের কর ছাড় দেওয়া হয়। দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়মে চলছে দেশ। বাংলাদেশে কর ফাঁকি নিয়ে মিডিয়া ও গণমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা-সমালোচনা চললেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বড় বড় ব্যবসায়ী শিল্পগ্রুপ ঠিকই কর ফাঁকি দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা হচ্ছেন- দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। 

তারা ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও শিল্প বিকাশে অবদান রাখে। সরকার ব্যবসায়ীদের ঋণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে বিনিময়ে তারা সরকারকে কর-শুল্ক প্রদান করবে। কিন্তু বাংলাদেশে তার উল্টো চিত্র দেখা যায়। এ দেশে লাখ লাখ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে যা সরকারকে ন্যায্য পরিমাণ কর-শুল্ক প্রদান করে না। অধিকাংশ সময় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে কর-শুল্ক মওকুফ করে নিয়েছে। ফলে এ দেশটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত ও অনুন্নত রয়ে গেছে। 

করোনার সময় বড় বড় শিল্পগ্রুপ প্রণোদনা প্যাকেজের নামে ঋণ নিয়ে নয়ছয় করেছে। ঋণ নিয়ে পরবর্তী সময়ে সেই ঋণ পরিশোধ না করে ইচ্ছাকৃতভাবে খেলাপি করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- বড় বড় ব্যবসায়ী শিল্পপতি কর ফাঁকি ও কর মওকুফের সুবিধা আদায় করার ফলে ছোট ছোট ব্যবসায়ী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না। যার ফলে ছোট ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। 

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে কর আদায়ে জড়িত সরকারি রাজস্ব কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিতে লিপ্ত। বছরের পর বছর ধরে অসাধু কর্মকর্তারা গোপন সমঝোতা, ঘুষ ও কারচুপির মাধ্যমে কর ফাঁকিতে সহায়তা করে যাচ্ছেন। রাজস্ব কর্মকর্তারা মনগড়া গৃহকর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর নির্ধারণ করে ৫০ কোটি টাকার করকে ৫ কোটি টাকায় রূপান্তর করার বহু নজির রয়েছে। ঘুষের বিনিময়ে কর কমিয়ে দিয়ে তারা সরকারি রাজস্ব আদায়ে বাধা সৃষ্টি করছেন। 

দেশের সব সরকারি কর অফিসে জালিয়াতির মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের সরকারি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসগুলো হচ্ছে দুর্নীতি ও কর ফাঁকির উল্লেখযোগ্য স্থান। দেশের প্রতিটি সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা ও কর্মচারী দুর্নীতি ও জাল-জালিয়াতিতে লিপ্ত। বেশিরভাগ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি রাজস্ব খেয়ে ফেলছে দুর্নীতিপরায়ণ একশ্রেণির কর্মচারী। নেপথ্যে থাকে সাব-রেজিস্ট্রারসহ প্রভাবশালীরা। 

কোথাও কোথাও আবার ঘুষ-সিন্ডিকেটের সদস্যরাই রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। জমি রেজিস্ট্রি দলিলের সরকারি ভ্যাট ও উৎসে কর ঢুকছে ঘুষ চক্রের পকেটে। এই শক্তিশালী সিন্ডিকেট চক্র মিথ্যা তথ্য ও জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সরকারি রাজস্ব নিজের পকেটে নিয়ে নিচ্ছেন। তারা প্রকৃত রাজস্ব ফাঁকি দিতে বায়না দলিল গোপন রেখে সাফ কবলা দলিলে সম্পত্তির মূল্য অনেক কম দেখিয়ে রেজিস্ট্র্রি সম্পন্ন করেছে। 

রাজস্ব আহরণ প্রতিষ্ঠানের গতানুগতিক ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরে কালোবাজারিরা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বৈধ-অবৈধ পথে বর্ডার দিয়ে পণ্যদ্রব্য পরিবহন করছে। বর্ডারে কর্তব্যরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অবহেলা এবং অসাধু কাস্টমস অফিসারের যোগসাজশে পণ্যদ্রব্য আনা-নেওয়ার কাজ দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছে। এতে করে সরকার বছরের পর বছর রাজস্ব আয় হতে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি কাস্টমস কর্মকর্তারা হাজার কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, সরকার কঠোর নজরদারির মাধ্যমে কালোবাজারি কমিয়ে আনলে রাজস্ব আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। 

বাংলাদেশে রাজস্ব আহরণের প্রধান খাত হলো ভ্যাট। দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক প্রভাব ও অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ভ্যাট ফাঁকি দিয়ে আসছে। আবার অসংখ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা ভ্যাট পরিশোধে সক্ষম হলেও তারা তা প্রদান করে না। অনেকে অনলাইনে ভ্যাট নিবন্ধনও নেয়নি। সে জন্য ভ্যাট আদায় প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার লক্ষ্যে সংস্কার প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা যাতে ভ্যাট ফাঁকি দিতে না পারে সে জন্য রাজস্বনীতি ও করনীতি প্রণয়ন করতে হবে। 

এ জন্য আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস আইনের আধুনিকায়ন ও ন্যায়ভিত্তিক পেশাদারিত্ব সৃষ্টি করা প্রয়োজন। দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ১২৬ প্রতিষ্ঠান গত অর্থবছরে ১,৫৮৫ কোটি টাকা ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলো প্রকৃত বিক্রয়ের হিসাব গোপন রেখে কম বিক্রির তথ্য দেখিয়ে এবং ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করে ভ্যাট কম পরিশোধ করত। ভ্যাট ফাঁকিবাজদের পাশাপাশি দায়ী কর্মকর্তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। 

দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করার জন্য নতুন সরকারকে বিভিন্ন ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। 
সেই লক্ষ্যে সরকারি রাজস্ব সংস্থা এনবিআরে কর্মরত দুর্নীতিবাজ অফিসারদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

কর ন্যায্যতার দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপক কর ফাঁকি সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে এবং আইনের প্রতি অনুগত নাগরিকদের ওপর করের বোঝা বাড়িয়ে দেয়। কর ফাঁকি ছাড়াও প্রণোদনা ও কর ছাড়ের কারণে সরকার প্রতি বছর বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে। বিনিয়োগের কথা বলে বিভিন্ন খাতভিত্তিক কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। 

এগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। প্রণোদনা বা করছাড় বিনিয়োগের ভিত্তি হতে পারে না। সুতরাং রাজস্ব আদায়ের জন্য নতুন নতুন করদাতা চিহ্নিত করে রাজস্ব ফাঁকি ঠেকানোর জন্য মাঠ পর্যায়ে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। চলমান অবস্থা থেকে উত্তরণে কর জালের আওতা বৃদ্ধি এবং কর অব্যাহতির প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। 

প্রাবন্ধিক

সময়ের আলো/জেডি 


  বিষয়:   কর-শুল্ক  ফাঁকি  বন্ধ  রাজস্ব ঘাটতি 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: