বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। মানুষের হাতে হাতে স্মার্টফোন, ঘরে ঘরে ইন্টারনেট, আর প্রতিটি মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ উপস্থিতি আমাদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। একসময় মানুষ খ্যাতি অর্জন করত জ্ঞান, কর্ম, সততা কিংবা সৃজনশীলতার মাধ্যমে। আজ সেই জায়গা অনেকাংশে দখল করে নিয়েছে ‘ভাইরাল’ হওয়ার সংস্কৃতি। এখন যেন যোগ্যতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কে কত দ্রুত মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারছে।
ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রতিনিয়ত চলছে ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় কেউ হাস্যকর ভিডিও বানাচ্ছে, কেউ ব্যক্তিগত জীবনকে প্রকাশ্যে এনে আলোচনায় আসছে, কেউ আবার বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে মানুষের দৃষ্টি কাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রতিযোগিতার চাপে সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
একসময় সমাজে আদর্শ মানুষ হিসেবে বিবেচিত হতেন শিক্ষক, গবেষক, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী বা সমাজসেবকরা। আজ অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে আদর্শ হয়ে উঠছেন এমন কিছু ব্যক্তি, যাদের প্রধান পরিচয় কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা। ফলে সাফল্যের সংজ্ঞাও বদলে যাচ্ছে। মানুষ এখন ভাবছে, আলোচনায় থাকাই সাফল্য, তা ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক।
আরও পড়ুন
ভাইরাল হওয়ার এই সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যাওয়া। মানুষ যাচাই-বাছাই না করেই তথ্য ছড়িয়ে দিচ্ছে। গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং অপপ্রচার মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। বাংলাদেশের প্রায় ২৯ হাজার তরুণ-তরুণীকে নিয়ে পরিচালিত ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রতি তিনজনের মধ্যে দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া খবর ও বিভ্রান্তিকর তথ্যকে তাদের মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং একটি সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। কারণ মিথ্যা তথ্য যত দ্রুত ছড়ায়, সত্য তত দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে না। ভাইরাল হওয়ার তাড়নায় অনেকেই দায়িত্বশীলতার পরিবর্তে উত্তেজনা ও চমকের আশ্রয় নিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা অসংখ্য বাস্তব ঘটনা দেখেছি, যেখানে শুধু অনলাইন জনপ্রিয়তার জন্য মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করেছে। কেউ ট্রেনের ছাদে উঠে ভিডিও ধারণ করেছে, কেউ ব্যস্ত সড়কে বিপজ্জনক স্টান্ট দেখিয়েছে, কেউ আবার অন্যের ব্যক্তিগত দুর্ভোগকে কনটেন্টে পরিণত করেছে। এসব কর্মকাণ্ড কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য নয়, সামগ্রিক সামাজিক সংস্কৃতির জন্যও হুমকি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ধারণাও দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। মানুষের দুঃখ, কান্না, দুর্ঘটনা, এমনকি মৃত্যুকেও অনেক সময় কনটেন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। আগে যেখানে মানবিকতা মানুষকে সংযত করত, এখন সেখানে অনেক ক্ষেত্রে ভিউ এবং শেয়ারের হিসাব প্রাধান্য পাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব শিশু-কিশোরদের ওপর আরও গভীর। ইউনিসেফের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিশোর-কিশোরী মনে করে ইন্টারনেটে তাদের জন্য আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রয়োজন। একই জরিপে প্রায় ২০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী অনলাইন হয়রানি বা নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো আমাদের সামনে কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে। একটি প্রজন্ম এমন এক ডিজিটাল পরিবেশে বড় হচ্ছে, যেখানে জনপ্রিয়তা প্রায়ই নৈতিকতার চেয়ে বেশি পুরস্কৃত হয়।