প্রযুক্তির উৎকর্ষ, অর্থনীতির বিস্তার এবং সভ্যতার অগ্রগতির উল্লাসের আড়ালে ভয়ংকর এক সংকটের মুখোমুখি পৃথিবী। এই সংকটের বড় কারণ জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন। জলবায়ুর এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর প্রকৃতির ধ্বংসাত্মক আশঙ্কাগুলো রূঢ় বাস্তবে পরিণত হতে চলেছে। এই আশঙ্কাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে ‘সুপার এল নিনো’। এটি একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা হলেও পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির সঙ্গে মিলে এই এল নিনো বৈশ্বিক বিপর্যয়ের নতুন বার্তা দিচ্ছে। এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক ও পর্যায়বৃত্ত জলবায়ু চক্র। সাধারণত প্রতি ২ থেকে ৮ বছর অন্তর এ ঘটনা ঘটে এবং এটি সারা বিশ্বের আবহাওয়ার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
কিন্তু ২০২৬ সালের এই এল নিনো সম্ভবত পৃথিবীর লিখিত ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে চলেছে। প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা আড়াই থেকে তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার যে পূর্বাভাস আমরা পাচ্ছি, তা বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার প্রচলিত ছক ভেঙে দিয়ে এক সম্পূর্ণ জলবায়ুগত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। এই বিপর্যয়ের ক্ষত কেবল কৃষিজমিতে বা আকাশের মেঘে নয়, তা ছড়িয়ে পড়বে মানব সভ্যতার প্রতিটি স্তরে। অর্থনীতি থেকে রাজনীতি, জনস্বাস্থ্য থেকে মানসিক বিপর্যয়, বাস্তুচ্যুতি থেকে সংঘাত পর্যন্ত প্রভাব বিস্তার করবে এই সুপার এল নিনো। যখন সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পায়, তখন এর প্রভাব শুধু বৃষ্টি বা খরার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও মানবজীবনের প্রতিটি স্তরে আঘাত হানে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন পৃথিবীর জলবায়ু ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। শিল্পায়নের ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উজাড় এবং কার্বন নিঃসরণ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে তুলেছে। এর ফলেই এল নিনোর মতো প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে উঠছে। কিন্তু ‘সুপার এল নিনো’ হলো এর আরও শক্তিশালী ও বিধ্বংসী রূপ। ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকার জাম্বিয়া ও জিম্বাবুয়ের করেকাটোবা বাঁধের জলস্তর এতটাই নেমে গিয়েছিল যে তারাসহ আশপাশের দেশগুলো দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন থেকেছে। বিদ্যুৎহীনতা মানে কেবল অন্ধকার নয়- হাসপাতালে চিকিৎসা বন্ধ, শিল্প কারখানা স্থগিত, হিমাগারে পচে যাওয়া সবজি ও ওষুধ। জনস্বাস্থ্যের ওপর এল নিনোর প্রভাব বিশেষভাবে বিপজ্জনক, তার পরও আন্তর্জাতিক মহলে এই বিষয়ে গবেষণা এখনও প্রয়োজনীয় মনোযোগ পাচ্ছে না। গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও কলেরার জীবাণু অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
একাধিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় প্রকাশ পেয়েছে এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তীব্র তাপপ্রবাহে শিশু ও বৃদ্ধদের মৃত্যুর হার বাড়ে। অপুষ্টির কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া মানুষের দেহে যক্ষ্মার মতো পুরোনো রোগও নতুন করে মাথা চাড়া দেয়। এই বিপদ কেবল দরিদ্র দেশের নয়, তাপপ্রবাহ ইউরোপেও হাজার হাজার মানুষের প্রাণ নিয়েছে এবং উষ্ণ পৃথিবীতে সেই সংখ্যা আরও বাড়বে। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ব্রাজিল, কেনিয়া- এসব দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিরাট অংশ আসে জলবিদ্যুৎ থেকে। বৃষ্টিপাতের ঘাটতি মানেই জলাধারের স্তর নেমে যাওয়া, আর তার অর্থ হলো কোটি কোটি মানুষের ঘরের আলো নিভে যাওয়া। ভৌগোলিকভাবে সমুদ্র তীরবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সুপার এল নিনো আরও বড় উদ্বেগের বিষয়। এ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, নদীনির্ভর অর্থনীতি এবং ঘনবসতি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। সুপার এল নিনোর প্রভাবে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাতের অস্বাভাবিকতা দেখা দিতে পারে। কখনো অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা আবার কখনো দীর্ঘ খরায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ধান, গম ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এ ছাড়া তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে জনস্বাস্থ্যও চরম ঝুঁকিতে পড়বে। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়বে। অন্যদিকে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ফলে ডায়রিয়া, ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার মতো রোগের প্রকোপও বৃদ্ধি পেতে পারে। নগরাঞ্চলে বসবাসকারী দরিদ্র মানুষ, শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হবে। সুপার এল নিনোর আরেকটি ভয়ংকর দিক হলো- অর্থনৈতিক ক্ষতি।
কৃষি উৎপাদন কমে গেলে দ্রব্যমূল্য বাড়বে, খাদ্য আমদানির চাপ বাড়বে এবং নিম্নআয়ের মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠবে। অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে। শিল্প উৎপাদন ও শ্রমঘণ্টা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও থাকবে। অর্থাৎ সুপার এল নিনো কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতারও বড় চ্যালেঞ্জ। সুপেয় মিষ্টি পানির সংকট এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে কম আলোচিত কিন্তু সবচেয়ে বিপজ্জনক সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি। পৃথিবীর মোট সুপেয় মিষ্টি পানির প্রায় সত্তর শতাংশ আসে হিমবাহ থেকে গলা পানি ও বৃষ্টিপাতের সংমিশ্রণে। এল নিনো যখন বৃষ্টির ধারা উল্টিয়ে দেবে তখন শুধু ভূপৃষ্ঠের জলাধার শুকাবে না সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নামতে থাকবে। পাকিস্তান, মেক্সিকো ও পশ্চিম আফ্রিকার বহু অঞ্চলে এই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক হারে কমে যাচ্ছে। সুপার এল নিনোর আঘাতে এই প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হলে কোটি মানুষ মিষ্টি পানির জন্য হাহাকার করবে এবং ইতিহাস সাক্ষী সুপেয় মিষ্টি পানির জন্য মানুষ যুদ্ধ করে। হয়তো এর প্রভাবেই ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সৃষ্টি হবে। অতীতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার যুগলবন্দি কার্যকলাপে বহু রাজনৈতিক অস্থিরতা জন্ম হয়েছে।
১৮৭৫-৭৮ সালের মহাখরার পর এশিয়া ও আফ্রিকায় যে গণঅভ্যুত্থান ও বিদ্রোহ দেখা গিয়েছিল, তার পেছনে ছিল অনাহার ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার যুগলবন্দি। আধুনিক গবেষণা দেখাচ্ছে, খরা ও দুর্ভিক্ষের পরের বছরগুলোতে গৃহযুদ্ধ ও সামাজিক সংঘাতের সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। চলমান অস্থির আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকটের সঙ্গে যদি নতুন করে সুপার এল নিনোর প্রভাবে কৃষি বিপর্যয় যুক্ত হয়, তবে পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বাস্তুচ্যুতি ও অভিবাসনের প্রশ্নটিও এখানে অপরিহার্য। খরা ও দুর্ভিক্ষ মানুষকে তার শিকড় থেকে উপড়ে ফেলে।
এশিয়া অঞ্চল থেকে অভিবাসীরা ইউরোপের দিকে অধিক পরিমাণে ঝুঁকে পড়বে। বিশেষত আগামীর এল নিনো আরও বড় মাপের বাস্তুচ্যুতির ঢেউ তুলতে পারে বাংলাদেশের উপকূল, আফ্রিকার শুদ্ধপ্রান্ত ও এশিয়ার মৌসুমি অঞ্চল থেকে। এই মানবঢেউ শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে ঢেলে সাজাতে পারে, জাতীয়তাবাদী উগ্রতাকে উসকে দিতে পারে এবং বহু দেশের অভ্যন্তরীণ সংহতিকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। সুপার এল নিনোর প্রভাবে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রেরও বিপর্যয় ঘটবে। সমুদ্র তীরবর্তী দেশ হিসেবে এটাও আমাদের মাথা ব্যথার কারণ। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোতে বিশ্বের ১৬ শতাংশ প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। প্রবালপ্রাচীর কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, এটি লাখ লাখ সামুদ্রিক প্রজাতির আবাস এবং কোটি কোটি মানুষের খাদ্য ও জীবিকার উৎস। প্রবাল ধ্বংস মানে মৎস্যসম্পদ হ্রাস, যা বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া থেকে ফিলিপাইন, মালদ্বীপ থেকে ভারতের উপকূল পর্যন্ত লাখ লাখ মৎস্যজীবীর জীবিকা কেড়ে নেবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি নাজুক হলে সবচেয়ে আর্থিক বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশের। আর্থিক বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের ওপর এল নিনোর প্রভাব ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। গম, চাল, চিনি ও তেলবীজের আন্তর্জাতিক দাম যখন লাফ দিয়ে বাড়ে, তখন সেই মূল্যবৃদ্ধির আঁচ লাগে বাংলাদেশের রান্নাঘর থেকে নাইজেরিয়ার বাজার পর্যন্ত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- পৃথিবী এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে এই সংকট মোকাবিলায় এগিয়ে আসেনি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনগুলোতে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দেখা যায় অনীহা ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।
উন্নত দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণ করলেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মূলত উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলো। জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তাই আজ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তা হলে আমাদের করণীয় কী? প্রকৃতিকে জয় করার দাম্ভিকতা পরিহার করে প্রকৃতির ছন্দের সঙ্গে আমাদের নীতিনির্ধারণকে মেলাতে হবে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর উচিত এখন থেকেই সুপার এল নিনো মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা।
কৃষিতে জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, শহরে সবুজায়ন বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন নীতি গ্রহণ করতে হবে। শুধু সরকারের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে। অপ্রয়োজনীয় জ্বালানি ব্যবহার কমানো, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ রক্ষায় ব্যক্তিগত দায়িত্ব পালন এখন সময়ের দাবি। প্রকৃতি বারবার আমাদের সতর্ক করছে। কখনো ঘূর্ণিঝড়, কখনো দাবদাহ, কখনো বন্যা কিংবা খরার মাধ্যমে পৃথিবী যেন জানিয়ে দিচ্ছে অসীম ভোগবাদ ও পরিবেশ ধ্বংসের পথ মানবসভ্যতার জন্য কখনোই টেকসই নয়। আমরা যদি এখনও সচেতন না হই, তবে আগামী প্রজন্মকে একটি অনিরাপদ, উত্তপ্ত ও দুর্যোগপূর্ণ পৃথিবী উপহার দিতে হবে।
শিক্ষক, গবেষক ও লেখক
এএডি/