অতীত সরকারের অনিয়ম-দুর্নীতির সাক্ষ্য বহন করছে মিল্কভিটা। প্রতিষ্ঠানটির শত শত কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। প্রায় সাড়ে তিন লাখ দুগ্ধ খামারির স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠিত সমবায়ী এই প্রতিষ্ঠানকে বইতে হচ্ছে অতীত সরকারের দুর্নীতির ভার। ক্ষতির এই বোঝা শেষ পর্যন্ত চাপছে
কৃষক, করদাতা এবং ভোক্তারা কাঁধে।
আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে মিল্কভিটা প্রায় ৬৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে তিনটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করে। এর মধ্যে ফরিদপুরে ৩৮৭ কোটি টাকার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এমন এলাকায় স্থাপন করা হয়, যেখানে পর্যাপ্ত কাঁচামালের জোগান ও বাজার নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আগেই আপত্তি জানিয়েছিল।
নরসিংদী ও রংপুরের প্রকল্পে প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই, দক্ষ জনবল প্রস্তুত এবং পরিচালন সক্ষমতা নিশ্চিত করা হয়নি। এসব কারখানায় আমদানি করা যন্ত্রপাতি চালুই করা যায়নি। বছরের পর বছর পড়ে থেকে সেগুলো নষ্ট হয়েছে। ৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের পর বাতিল হয়েছে একটি প্রকল্প। এখন কারখানার অনেক যন্ত্রপাতি কেজি দরে বিক্রির কথা ভাবতে হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে এমন পরিণতি কেবল জনগণের করের টাকার অপচয় নয়, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
কোনো শিল্প প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে কাঁচামালের প্রাপ্যতা, বাজার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জনবল প্রশিক্ষণ এবং পরিচালন ব্যয় বিশ্লেষণ করতে হয়। মিল্কভিটা কারখানাগুলো স্থাপনে এসব মৌলিক বিষয় কি বিবেচনা করা হয়েছিল? যদি না করা হয় তা হলে বলতে হবে যে, অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বহুমাত্রিক। মিল্কভিটার ঘটনা আমাদের এই বার্তাই দেয় যে, পরিকল্পনাহীন প্রকল্পে সম্পদের সম্পূর্ণ অবচয়ই ঘটে কেবল। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে খামারিদের ওপর।
প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা না বাড়ার কারণে তারা বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থিতিশীল ক্রয়ব্যবস্থার সম্ভাব্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয় যখন পরিকল্পনা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি একসঙ্গে কাজ করে। এর ব্যত্যয় হলেই কারখান চালুর আগেই শত শত কোটি টাকার যন্ত্র মরিচা ধরে, প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়।
কেউ এমন যুক্তি দিতে পারেন যে, শিল্প প্রকল্পে সবসময় ঝুঁকি থাকে, সব বিনিয়োগ সমান সফল হয় না। আমরা বলব, ঝুঁকি আর অব্যবস্থাপনা এক বিষয় নয়। কোনো প্রকল্পে প্রত্যাশিত ফল না-ও মিলতে পারে। তবে কারখানা চালু হওয়ার আগেই যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যাওয়া, দক্ষ জনবল না থাকা, সম্ভাব্যতা যাচাই উপেক্ষা করা কিংবা প্রশাসনিক আপত্তি অগ্রাহ্য করা গ্রহণযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে না।
৬৪৮ কোটি টাকার প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ কারিগরি, আর্থিক ও প্রশাসনিক নিরীক্ষা সম্পন্ন করে দায় নির্ধারণ করতে হবে। বর্তমান প্রশাসন প্রকল্পের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে। তদন্তের এই উদ্যোগ ইতিবাচক। দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া জরুরি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকল্পের কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এটা করা জরুরি।
মিল্কভিটার এসব কারখানায় এখনও যেসব যন্ত্রাংশ ব্যবহারযোগ্য আছে সেগুলো দ্রুত উদ্ধার করতে হবে। সম্ভব হলে এসব যন্ত্রাংশ পুনর্ব্যবহারের উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ও সমবায়ী খাতের বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে স্বাধীন সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ এবং দক্ষ জনবল প্রস্তুতির বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। সমবায় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনায় খামারিদের প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণও শক্তিশালী করতে হবে।
সময়ের আলো/এসএকে