চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান : প্রবাসীদের স্বদেশচেতনা

ড. মাহরুফ চৌধুরী

মতামত

প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তারা কোনো দিন

2026-08-03T06:04:33+00:00
2026-08-03T06:16:52+00:00
 
  সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬,
১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩
সোমবার, ৩ আগস্ট ২০২৬
মতামত
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান : প্রবাসীদের স্বদেশচেতনা
ড. মাহরুফ চৌধুরী
প্রকাশ: সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৪ এএম  আপডেট: ০৩.০৮.২০২৬ ৬:১৬ এএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তারা কোনো দিন ভুলতে পারবেন না। তখন ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে, দূরে থাকলেও তাদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল।

ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের পথে রাজনৈতিক গতিধারা নতুন মোড় নেয়। সেই মুহূর্তগুলো কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ হয়ে থাকে না। বরং সেটি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা সব মানুষের সমগ্র জাতিসত্তার চেতনাকে গভীরভাবে আলোড়িত করে। 

ইতিহাসের প্রতিটি বড় গণআন্দোলন, গণজাগরণ কিংবা রাষ্ট্ররূপান্তরের প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে যে, দেশের ভৌগোলিক সীমানার বাইরে অবস্থান করেও প্রবাসীরা নানাভাবে সেই পরিবর্তনের অংশ হয়ে ওঠেন। বাংলাদেশের চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান তেমনই একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ, যা দেশের সীমানা অতিক্রম করে বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনোজগতে গভীর আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান করেও তারা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র বিনির্মাণের প্রশ্নে প্রত্যক্ষ অংশীদারের মতোই উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত ও সক্রিয় ছিলেন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোতে প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল যখন স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল। আধুনিক বিশ্বে ইন্টারনেট কেবল একটি প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কিংবা উপযোগিতা নয়; এটি প্রবাসী মানুষের জন্য স্বদেশের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সেতুবন্ধন। 

প্রতিদিনের ফোনকল, ভিডিও আলাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বার্তা কিংবা সংবাদপত্রের অনলাইন সংস্করণ প্রভৃতি সবকিছু মিলিয়েই নানা মাধ্যমে প্রবাসীরা তাদের দেশকে কাছে অনুভব করেন। সেই সেতুবন্ধন যখন হঠাৎ ভেঙে পড়ে, তখন দূরত্বের বাস্তবতা নির্মমভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়, নিজেদের ভাবতে হয় ভিনগ্রহের বাসিন্দা। 

১৯ জুলাই ২০২৪-এর সেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মুহূর্তে অসংখ্য প্রবাসীর কাছে মনে হয়েছিল যেন বাংলাদেশ হঠাৎ করেই পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আড়াল হয়ে গেছে। আমার মতো অনেকের চেতনায় বাংলাদেশ যেন এ দুনিয়া থেকে হারিয়ে গিয়েছিল। সময় কাটাতে হয়েছিল দুর্যোগকালীন উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা নিয়ে। দেশে কী ঘটছে, কারা নিরাপদ আছে, কারা বিপদের মধ্যে আছে, কীভাবে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা যেতে পারে এসব কোনো কিছুই আর নিশ্চিতভাবে জানার উপায় ছিল না।

রাষ্ট্র যখন তথ্যপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মানুষের কল্পনা ও আশঙ্কা বাস্তবতার চেয়েও দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, তথ্যের অভাব প্রায়ই মানুষের উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। কারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভয় পায় সেই অজানাকে, যার সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য ও ধারণা পাওয়া যায় না। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসরত অসংখ্য বাংলাদেশির কাছে সেই দিনগুলো ছিল অসহায়ত্ব, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা এবং মানসিক যন্ত্রণার এক দীর্ঘ অধ্যায়। 

অনেক প্রবাসী রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন। কর্মস্থলে থেকেও কাজে মনোযোগ দিতে পারেননি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে বসেও মন পড়ে ছিল বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে। দেশে মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানসন্তুতি, আত্মীয়স্বজন কিংবা বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ না থাকায় তাদের প্রতিটি মুহূর্ত কাটছিল অনিশ্চয়তার মধ্যে। কোনো অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে মনে হতো হয়তো দেশের কারও খবর পাওয়া যাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সামান্য কোনো তথ্যের সন্ধানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে দিয়েছেন অনেকে। কিন্তু তথ্যের চেয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ভয়তাড়িত অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার ভারই তখন ছিল বেশি।

আমি নিজেও সত্যিকার অর্থে সেই জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলোতে কোনো কিছুতেই মনোযোগ দিতে পারিনি। প্রবাসজীবনের ব্যস্ততা, পেশাগত দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কাজ সবকিছুই যেন অর্থহীন মনে হচ্ছিল। সারাক্ষণ মনে হতো, দেশে কী হচ্ছে? আমাদের আত্মীয়স্বজনরা কেমন আছে? পরিচিতজনদের কেউ বিপদে পড়েছে কি না? নানাভাবে মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বহু প্রবাসী আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের সবশেষ সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানার জন্য। 

কেউ তাদের পরিবারের খোঁজ জানতে চেয়েছেন, কেউ বন্ধুদের খবর জানতে চেয়েছেন, আবার কেউ কেবল নিশ্চিত হতে চেয়েছেন যে তাদের প্রিয় মানুষগুলো এখনও নিরাপদ আছেন। সেই ফোনকল, বার্তা এবং উদ্বেগভরা প্রশ্নগুলো আজও স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে আছে। সেই সময় প্রবাসীদের অভিজ্ঞতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাদের সম্মিলিত মানসিক যন্ত্রণা। 

একজনের উৎকণ্ঠা আরেকজনের উদ্বেগকে স্পর্শ করছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্রবাসী গ্রুপ, কমিউনিটি ফোরাম এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের নেটওয়ার্কগুলো তখন পরিণত হয়েছিল উদ্বিগ্ন মানুষের অনানুষ্ঠানিক সহায়তা ব্যবস্থায়। কেউ সামান্য কোনো তথ্য পেলেই অন্যদের জানাতেন, কেউ সম্ভাব্য যোগাযোগের পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন, কেউ আবার শুধু মানসিক সমর্থন দেওয়ার জন্য অন্যদের পাশে দাঁড়াতেন। এই সম্মিলিত উদ্বেগ ও পারস্পরিক সংযোগই প্রমাণ করে যে, প্রবাসী সম্প্রদায় কেবল বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের সমষ্টি নয়; বরং একটি বিস্তৃত মানবিক ও আবেগিক নেটওয়ার্ক, যার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করে স্বদেশচেতনা।

প্রবাসীদের জীবনে হয়তো অনেক স্মৃতি আসে-যায়, কিন্তু দেশের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার জুলাইয়ের সেই মুহূর্তগুলো তারা কোনো দিন ভুলতে পারবেন না। তখন ভৌগোলিক দূরত্ব যেন হঠাৎ করেই বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল। 

প্রবাসীরা নতুন করে উপলব্ধি করেছিলেন যে, দূরে থাকলেও তাদের হৃদয়, চিন্তা এবং অস্তিত্বের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের সঙ্গেই বাঁধা। স্বদেশের সংকট তখন তাদের ব্যক্তিগত সংকটে পরিণত হয়েছিল। সেই ঘুমহীন রাতগুলো, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কাটানো দীর্ঘ প্রহরগুলো এবং একটি ফোনকলের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষের মুখ আজ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসের এক নীরব কিন্তু গভীর মানবিক দলিল হয়ে আছে।

দেশের লাখো পরিবার প্রবাসীদের উপার্জনের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল। পরিবার-পরিজনের শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের ব্যয় নির্বাহে প্রবাসীদের অবদান অপরিসীম। তারা কেবল অর্থ পাঠান না; দেশের সুখ-দুঃখ, উন্নয়ন ও সংকটের অর্থনৈতিক দায়ভারও বহন করেন। 

ফলে দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা তাদের জন্য কেবল একটি সংবাদ নয়; বরং তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের জীবনমান উন্নত করে না; জাতীয় অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। 

ফলে প্রবাসীরা যখন দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হন, তখন সেই উদ্বেগের সঙ্গে অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নও অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে। তারা জানেন, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন কেবল দেশের মানুষের জন্যই নয়; তাদের নিজেদের পরিবার এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বদেশচেতনা, আপনজনের প্রতি আবেগগত বন্ধন এবং অর্থনৈতিক দায়বদ্ধতা- চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রবাসীদের গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ফলে তারা কেবল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাননি; বরং নানাপন্থায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করেছেন এই নাগরিক অধিকার আদায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামে। ভৌগোলিক দূরত্ব তাদের শারীরিক উপস্থিতিকে সীমিত করতে পেরেছিল, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা, গণদাবির পক্ষে অবস্থান এবং স্বৈরাচারী সরকারবিরোধী কর্মতৎপরতাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। 

বরং অনেক ক্ষেত্রে দূর থেকে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ তাদেরকে আন্দোলনের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠন এবং বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থাকে কাজে লাগানোর বিশেষ সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নাগরিকদের আন্দোলন ছিল না; এটি ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বাংলাদেশি চেতনারও বহিঃপ্রকাশে পরিণত হয়েছিল, যার সক্রিয় অংশীদার ছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

প্রবাসীদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল অর্থনৈতিক সহযোগিতা। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, আহত ব্যক্তি, নিহতদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে বহু প্রবাসী ব্যক্তি ও সংগঠন আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা নিজ নিজ উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহ করেছেন, সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং সংকটাপন্ন পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছেন। 

মানবিক সহায়তার এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এটি ছিল জাতীয় সংহতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের একটি শক্তিশালী প্রকাশ। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের মধ্যে রেমিট্যান্স প্রবাহ সাময়িকভাবে স্থগিত বা সীমিত করার আহ্বানও দেখা যায়, যা সরকারের প্রতি এক ধরনের প্রতীকী এবং অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। 

প্রবাসীদের একটি অংশ মনে করেছিল যে, রাষ্ট্র যদি নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তা হলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তাদের অবস্থান প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এই উদ্যোগের ব্যাপ্তি ও কার্যকারিতা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও এটি ঐক্য ও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল। এটি প্রমাণ করে যে প্রবাসীরা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের প্রভাব প্রয়োগের সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং প্রয়োজনে অর্থনৈতিক শক্তিকেও নাগরিক অবস্থানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে প্রস্তুত ছিলেন।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রবাসীদের ভূমিকার একটি বিশেষ দিক ছিল তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে অনেক সময় ‘নাগরিক কূটনীতি’ (সিটিজেন ডিপ্লোমেসি) বলা হয়, যেখানে সাধারণ নাগরিকরাই আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তুলে ধরার দায়িত্ব পালন করেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছিলেন। তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফিং দেন, বিবৃতি প্রদান করেন, তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন। 

অনেক দেশে স্মারকলিপি প্রদান, চিঠি প্রেরণ, গোলটেবিল আলোচনা আয়োজন, সংবাদ সম্মেলন এবং প্রতিনিধি বৈঠকের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। বৈশ্বিক যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক ব্যবহারের এই সক্ষমতা আধুনিক প্রবাসী সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বাইরে থেকেও তারা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনানুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়েছেন।

রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন শহরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রতিবাদ সমাবেশ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, আলোচনা সভা এবং সংহতি কর্মসূচির আয়োজন করেন। লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো, সিডনি, বার্লিন, প্যারিস, রোম, স্টকহোমসহ বিশ্বের নানা শহরে অনুষ্ঠিত এসব কর্মসূচি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও জনমতের দৃষ্টি আকর্ষণে সহায়ক হয়েছিল। অনেক ক্ষেত্রে এসব কর্মসূচিতে শুধু বাংলাদেশিরাই নয়, বরং স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ এবং বিভিন্ন দেশের নাগরিকরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ফলে বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ একটি জাতীয় ইস্যুর গণ্ডি অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে প্রবাসীদের অবদান কেবল একটি পরিশিষ্ট নয়; বরং এটি সেই বৃহত্তর জাতীয় সংগ্রামের কাহিনিরই অংশ, যেখানে দেশের ভেতর ও বাইরের বাংলাদেশিরা মিলিতভাবে অন্যায়, বৈষম্য ও স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি নতুন ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিল। আর সেই কারণেই বলা যায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কেবল বাংলাদেশের মাটিতে সংঘটিত একটি রাজনৈতিক আন্দোলন নয়; বরং এটি ছিল সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশিদের হৃদয়ে একযোগে ধ্বনিত হওয়া স্বদেশচেতনার এক ঐতিহাসিক জাগরণ।

লেখক : ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য
মতামত লেখকের নিজস্ব

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান  প্রবাসী  স্বদেশচেতনা  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
মতামত- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: