গবেষণা কোনো একশ মিটার স্প্রিন্ট বা দ্রুতগতির দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি দীর্ঘ ও ধৈর্যের ম্যারাথন। এই যাত্রায় অনেকবার ব্যর্থতা আসবে, পরীক্ষার ফলাফল হয়তো আশানুরূপ হবে না কিংবা বহু সাধনার গবেষণাপত্রটি জার্নাল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু একজন সত্যিকারের গবেষক প্রতিটি ব্যর্থতা থেকেই নতুন কিছু শেখেন।
মানুষের স্বভাবজাত কৌতূহলই সভ্যতা বিকাশের মূল চালিকাশক্তি। অজানাকে জানা ও অচেনাকে চেনার এই নিরন্তর তৃষ্ণাই যুগে যুগে জন্ম দিয়েছে যুগান্তকারী সব আবিষ্কারের। বর্তমানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণদের মাঝে গবেষণার প্রতি যে বিপুল আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করছে।
তবে বাস্তব চিত্র হলো, প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী গবেষণার স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও সঠিক নির্দেশনার অভাবে তাদের বড় একটি অংশ মাঝপথেই খেই হারিয়ে ফেলে। শিক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন পরিসংখ্যান ঘাঁটলে দেখা যায়, স্নাতক পর্যায়ে গবেষণায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের অর্ধেকেরও বেশি শুধু কোথা থেকে শুরু করতে হবে— এটুকু না বোঝার কারণেই পিছিয়ে পড়ে।
গবেষণা কেবল সার্টিফিকেট অর্জন কিংবা নামের পাশে ভারী কোনো পদবি যুক্ত করার হাতিয়ার নয়; বরং এটি আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য অমীমাংসিত সমস্যার বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক সমাধান খোঁজার এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টা। তাই গবেষণার এই কণ্টকাকীর্ণ অথচ রোমাঞ্চকর পথে পা বাড়ানোর আগে এর প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও বাস্তবিক ধারণা থাকা অপরিহার্য।
প্রতিটি বড় আবিষ্কারের সূচনা হয় একটি সাধারণ প্রশ্ন থেকে। গবেষণার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো নতুন কোনো ধারণা বা সমস্যা খুঁজে বের করা এবং তার সম্ভাব্য উত্তরের একটি রূপরেখা দাঁড় করানো, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হাইপোথিসিস’ বা অনুমিত সিদ্ধান্ত বলা হয়। অনেকেই মনে করেন, গবেষণার বিষয়বস্তু বুঝি কেবল মোটা বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকে।
কিন্তু বাস্তবে আমাদের চারপাশেই এমন অসংখ্য উপাদান ছড়িয়ে আছে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হতে পারে নতুন আইডিয়া খোঁজার বিশাল আধার। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষ ইন্টারনেটে তাদের মতামত, ক্ষোভ বা সমস্যার কথা প্রকাশ করছেন।
একটি সাধারণ বিষয়ে মানুষের ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্যগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সেখান থেকে সমাজের লুকিয়ে থাকা মনস্তাত্ত্বিক বা কারিগরি সমস্যার সূত্রপাত ঘটা অস্বাভাবিক নয়। একজন প্রকৃত গবেষকের দৃষ্টি কেবল সমস্যার উপরিভাগেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তিনি সাধারণের চোখে দেখা নৈমিত্তিক ঘটনার পেছনের ‘কেন’ ও ‘কীভাবে’র উত্তর খুঁজতে সচেষ্ট হন। চারপাশের জগৎকে তীক্ষè পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করার এই গুণটিই একজন সাধারণ মানুষকে গবেষক হিসেবে গড়ে তোলে।
নতুন একটি আইডিয়া পাওয়ার পর অন্ধের মতো সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া বোকামি। গবেষণার অন্যতম ভিত্তি হলো ‘লিটারেচার রিভিউ’ বা আগের কাজের পর্যালোচনা, যা মূলত অতীতের জ্ঞানীদের সঙ্গে একধরনের নীরব কথোপকথন। বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর লাখ লাখ গবেষণাপত্র প্রকাশিত হচ্ছে। আপনার মনে আজ যে প্রশ্নটি উঁকি দিয়েছে, হতে পারে বিশ্বের অন্য কোনো প্রান্তে বসে কেউ একজন বছর দশেক আগেই তার উত্তর খুঁজে বের করেছেন।
তাই অতীত না জেনে নতুন কিছু সৃষ্টির চেষ্টা করা চাকা নতুন করে আবিষ্কার করার মতোই নিরর্থক শ্রম। আগের গবেষণাপত্রগুলো পড়ার মাধ্যমে একজন গবেষক বুঝতে পারেন, তার কাঙ্ক্ষিত ক্ষেত্রে এরই মধ্যে কতটুকু কাজ হয়েছে এবং ঠিক কোন জায়গায় এখনও শূন্যতা রয়ে গেছে। এই শূন্যতা পূরণের জন্যই প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট ‘মেথডলজি’ বা কর্মপদ্ধতি। আপনি কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করবেন, কোন বৈজ্ঞানিক উপায়ে সেগুলো বিশ্লেষণ করবেন এবং কীভাবে সিদ্ধান্তে পৌঁছাবেন— তার নিখুঁত নীলনকশা হলো এই মেথডলজি। একটি ভবনের ভিত্তি যেমন তার স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে, তেমনি একটি গবেষণার বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার মেথডলজির নিখুঁত কাঠামোর ওপর।
গবেষণার ফলাফল প্রস্তুত হওয়ার পর শুরু হয় আরেক মানসিক লড়াই— সঠিক জায়গায় কাজটির প্রকাশনা। আজকাল দ্রুত সফলতা পাওয়ার এক অশুভ প্রতিযোগিতা অ্যাকাডেমিক জগতে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে, যার সুযোগ নিচ্ছে একশ্রেণির ভুয়া বা ‘প্রিডেটরি জার্নাল’। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রতি বছর অসংখ্য নবীন গবেষক দ্রুত প্রকাশের প্রলোভনে পড়ে এসব ভুয়া জার্নালে হাজার হাজার ডলার অপচয় করছেন।
একটি মানসম্মত জার্নাল কখনোই রাতারাতি বা শুধু অর্থের বিনিময়ে কোনো গবেষণাপত্র ছাপায় না। সেখানে একটি লেখা জমা দেওয়ার পর তা কঠোর ‘পিয়ার রিভিউ’ বা সমকক্ষ বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে যায়, যা সম্পন্ন হতে অনেক সময় কয়েক মাস থেকে বছর পর্যন্ত লেগে যায়। ভালো জার্নাল চেনার উপায় হলো তাদের ‘ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর’, ‘স্কোপাস’ বা অন্য নির্ভরযোগ্য ইনডেক্সিং যাচাই করা। সত্যিকারের বিজ্ঞান সাধনায় শর্টকাট বলে কিছু নেই। অর্থের বিনিময়ে দ্রুত নিম্নমানের প্রবন্ধ ছাপিয়ে সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে, বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে একটি উচ্চমানের কাজ বিশ্বমানের জার্নালে প্রকাশ করা একজন গবেষকের জন্য অনেক বেশি সম্মানজনক ও তৃপ্তিদায়ক।
একাকী ঘরের কোণে বসে পৃথিবী জয় করার চিন্তা গবেষণার ক্ষেত্রে বেশ অবাস্তব ধারণা। বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে অভাবনীয় উন্নতি সাধিত হচ্ছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে ‘কোলাবোরেশন’ বা দলবদ্ধ কাজ। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানের শীর্ষস্থানীয় ও সর্বাধিক পঠিত গবেষণাপত্রগুলোর প্রায় আশি শতাংশই বিভিন্ন গবেষক, প্রতিষ্ঠান বা দেশের মধ্যকার যৌথ প্রচেষ্টার ফসল। বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে, যেখানে গবেষণার পর্যাপ্ত তহবিল বা অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরির সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই।
নবীনদের উচিত তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সিনিয়র শিক্ষার্থী বা একই বিষয়ে আগ্রহী অন্য গবেষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। একটি সুস্থ গবেষণাবান্ধব পরিবেশ কেবল কাঠামোগত সুবিধার ওপর নির্ভর করে না, বরং এটি গড়ে ওঠে অভিজ্ঞদের দিকনির্দেশনা এবং নবীনদের অদম্য কৌতূহলের এক অপূর্ব সম্মিলনের মাধ্যমে। একা হয়তো দ্রুত হাঁটা যায়, কিন্তু বহুদূর যেতে হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একযোগেই পথ চলতে হবে।
গবেষণা কোনো একশ মিটার স্প্রিন্ট বা দ্রুতগতির দৌড় প্রতিযোগিতা নয়; এটি একটি দীর্ঘ ও ধৈর্যের ম্যারাথন। এই যাত্রায় অনেকবার ব্যর্থতা আসবে, পরীক্ষার ফলাফল হয়তো আশানুরূপ হবে না কিংবা বহু সাধনার গবেষণাপত্রটি জার্নাল থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে আসবে। কিন্তু একজন সত্যিকারের গবেষক প্রতিটি ব্যর্থতা থেকেই নতুন কিছু শেখেন।
সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া উচিত। কেবল জীবনবৃত্তান্ত ভারী করার জন্য নয়, গবেষণার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, প্রকৃতির রহস্য উন্মোচন এবং সমাজকে একটি সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেওয়া। আমাদের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে মেধা ও সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে, তাকে সঠিক দিকনির্দেশনা এবং নৈতিক মূল্যবোধের ছাঁচে গড়ে তুলতে পারলে অচিরেই আমাদের দেশ থেকেও এমন সব যুগান্তকারী গবেষণা উঠে আসবে, যা সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। একটি উন্নত ও মানবিক পৃথিবীর স্বপ্নই হোক আমাদের প্রতিটি গবেষণার মূল চালিকাশক্তি।
লেখক : কবি ও লেখক
মতামত লেখকের নিজস্ব
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসএকে